গৌতম রায়

ভারতের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট, অযোধ্যা সংক্রান্ত যে মামলাটির রায় ঘোষণা করেছেন, সেই মামলাটির মূল প্রেক্ষিত ছিল। ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদের ধ্বংসস্তূপের জমির মালিকানা ঘিরেই ছিল মামলাটির মূল প্রেক্ষিত। বাবরি মসজিদের জমির মালিক ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদই? নাকি, শ্রীরামচন্দ্রের জন্মস্থানের দাবিদাররা? এটাই ছিল মূল মামলার বিবেচ্য বিষয়।

মন্দির ভেঙে মসজিদ তৈরির কোনও সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ, দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক প্রচেষ্টার ভিতর দিয়ে মন্দিরের দাবিদারেরা সংগ্রহ করতে পারেনি। তাই কোনও অবস্থাতেই এটা বলতে পারা যায় না যে, রাম মন্দিরকে ধ্বংস করে সম্রাট বাবর ওই মসজিদটি তৈরি করেছিলেন। এই কথা সুপ্রিম কোর্টকে পর্যন্ত স্বীকার করতে হয়েছে। পুরাতত্ত্বের সংগ্রহ করা নমুনা যে কথিত অতীতের রাম মন্দিরের ধ্বংসের নমুনা নয়, সেকথাও পরিষ্কার ভাবে সুপ্রিম কোর্টকে বলতে হয়েছে।

আর একদল ধর্মান্ধতার নাম করে একদল উন্মত্ত লোক যে প্রকাশ্য দিবালোকে মসজিদ ধ্বংস করেছে– তার সাক্ষ্য-প্রমাণ নতুন করে দেওয়ার কোনও দরকার হতে পারে না। জমিসংক্রান্ত বিরোধ বিষয়ক এই মামলায় যে স্থানটিতে ঐতিহাসিক মসজিদটিকে ধ্বংস করা হয়েছিল ‘৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর, সেই মসজিদের জায়গাটিতে ই রাম মন্দির নির্মাণের নির্দেশ প্রদান করলেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। আর সেই মন্দির নির্মাণের তদারকের ভিত্তিভূমি তৈরি করে দেওয়ার সময়সীমা পর্যন্ত বেঁধে দিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর নির্দেশিকা জারি করলেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত।

যে মসজিদটিকে ভেঙে দিল একদল দুর্বৃত্ত, সেই মসজিদটিকে তার কয়েকশো বছরের অবস্থান ভূমি থেকে উচ্ছেদ করে স্থানান্তরিত করার নির্দেশিকা জারি করছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত– একটি আধুনিক, বিজ্ঞান সম্মত যুগে দাঁড়িয়ে, দেশের সর্বোচ্চ আদালতের এই ধরনের নির্দেশ আগামী দিনের বিজ্ঞানমনস্ক, আধুনিক চিন্তা-চেতনার আবর্তে পরিচালিত মানুষ, কেবলমাত্র ভারতবর্ষের মানুষ নয়, গোটা বিশ্বের মানুষ, যাঁরা ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করেন, যাঁরা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাস করেন, জাতি- ধর্ম-ভাষা-লিঙ্গ ভিত্তিক সাম্যের চেতনায় বিশ্বাস করেন, তাঁরা কোন দৃষ্টিতে দেখবেন; তা ভাবতেই আতঙ্কে শিউরে উঠতে হয়।

জমির বিবাদ সংক্রান্ত একটি মামলায় দেশের সুপ্রিম কোর্ট, দেশের সরকারের উপর একটি পক্ষের কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক অবস্থানকে ফলপ্রসূ করে তোলার লক্ষ্যে কার্যত কাজ করছে, রাষ্ট্রের উপর সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার নির্দেশিকা জারি করছে– জানি না পৃথিবীর ইতিহাসে, সভ্যতার ইতিহাসে, এর কোনও নজির, অন্য কোনও দেশে আছে কিনা।

মানুষের স্বার্থবাহী বহু আদেশ আজ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট দিয়েছেন। এ সম্পর্কে তাঁদের অত্যন্ত সময়োপযোগী সাম্প্রতিক একটি আদেশ হল সমকাজে সমবেতনের আদেশ। সেই আদেশ পালনের প্রতি কেন্দ্রীয় সরকার আদৌ যত্নবান কিনা, সে দিকে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নজর দেয়ার মতো সময় আছে কিনা– তা নিয়ে মানুষ কিন্তু উদ্বিগ্ন।

রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন রাজনৈতিক শক্তির, রাজনৈতিক দাবির সঙ্গে সম্পৃক্ত, রাম মন্দির নির্মাণের বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের উপর দেওয়া নিজেদের নির্দেশ গিরে সুপ্রিম কোর্ট যথেষ্ট সক্রিয় ভূমিকা নেবে বলেই ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা হচ্ছে। ভারতবর্ষের সমন্বয়বাদী, বহুত্ববাদী চিন্তা-চেতনার ঐতিহাসিক ধারা প্রবাহের ভিতর দিয়ে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী জাতীয় আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে, লাখো লাখো মানুষের আত্মত্যাগের ভিতর দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতা রক্ষার্থে, যে ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান রচিত হয়েছে, সংখ্যালঘুর অধিকার সুরক্ষিত রাখার প্রশ্নে, ক্ষমতা হস্তান্তরের কালে ব্রিটিশের সঙ্গে যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেখানে যে প্রতিশ্রুতির কথা বলা হয়েছে, সেইসব প্রতিশ্রুতি অযোধ্যায় এই জমি বিবাদ মামলাকে কেন্দ্র করে রাম মন্দির নির্মাণের নির্দেশিকা জারির পর, আগামী দিনে কতখানি পালিত হবে, তা নিয়ে ঘোরতর সংশয়ের পরিবেশ ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে।

সংখ্যালঘুর সামাজিক অধিকার, অর্থনৈতিক অধিকার, ভারতবর্ষের বর্তমান শাসকদের দ্বারা দীর্ঘদিন ধরেই হরণ করা শুরু হয়ে গিয়েছিল এরপর তাঁদের বেঁচে থাকার অধিকারটুকু কতখানি লক্ষিত হবে তা নিয়েই এখন গোটা ভারতবর্ষের ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক বিবেক চরম শঙ্কার ভিতর সময় ক্ষেপণ করতে শুরু করছেন।