সুমন বটব্যাল, কলকাতা: ‘‘কি আর বলব বলুন৷এমনটাই হয়! কেউ কথা রাখে না৷তাই তৃণমূলের রাজত্বে বঞ্চিত আমাদের মতো ‘আদি’ তৃণমূলীরাই!’’ পৌষের দুপুরে একরাশ ক্ষোভ উগড়ে টেলিফোনের ওপার থেকে কথাগুলি বললেন মঞ্জু বসু৷

কে এই মঞ্জু বসু?

বরাবরই ডানপন্থী রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত৷ দলের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই তিনি ও তাঁর স্বামী তৃণমূলের একনিষ্ঠ সংগঠক৷রাজনৈতিক কারণে স্বামী খুন হওয়ায় অকাল বৈধব্য নেমে আসে তাঁর জীবনে৷সেটা ২০০০ সালের পয়লা এপ্রিল৷

নোয়াপাড়ার মাটিতে কান পাতলে আজও শুনতে পাওয়া যায়, তৃণমূলের তৎকালীন বিধায়ক বিকাশ বসুকে খুন হতে হয়েছিল দলেরই একাংশের অন্তর্ঘাতের জন্য৷ স্বামীর আসনে স্ত্রী মঞ্জুদেবীকে প্রার্থী করেছিলেন স্বয়ং দলনেত্রী৷ তখন কথায় কথায় তাঁর বাসায় ছুটে যেতেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷২০০১ ও ২০১১ বামেদের প্রবল দাপটের মাঝেও হাজার হাজার ভোটের ব্যবধানে দিদিমণির মুখ রক্ষা করেছিলেন তিনি৷

অথচ ২০১৬ সালে পরিবর্তনের বাংলায় ঘটে গেল উলটপুরাণ! মাত্র ১০৯৫ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হলেন মঞ্জুদেবী৷ সেসময় দলের ভেতরেই অভিযোগ উঠেছিল, স্থানীয় নেতৃত্বর একাংশের অন্তর্ঘাতের জেরেই ভোটযুদ্ধে ওয়াকওভার পেয়ে যায় বিরোধীরা৷ সূত্রের খবর, ভোটের ফল প্রকাশের পর স্থানীয় একাংশ নেতৃত্বর (জনশ্রুতি অর্জুন সিং) বিরুদ্ধে স্বয়ং দলনেত্রীর কাছে ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছিলেন তিনি৷ তারপর থেকেই বিরুদ্ধ গোষ্ঠী তাঁকে কোনঠাসা করার প্রক্রিয়া শুরু করেন৷

রাজনৈতিক মহলের মতে, কোনঠাসা করার সেই বৃত্ত সম্প্রতি সম্পূর্ণ হয়েছে নোয়াপাড়ার উপনির্বাচনে মঞ্জুদেবীর পরিবর্তে নিজের ভগ্নিপতি সুনীল সিংকে প্রার্থী করে শেষ হাসি হেসেছেন ভাটপাড়ার বিধায়ক অর্জুন সিং৷ তৃণমূলের অন্দরের খবর, স্বয়ং দলনেত্রীর ভাইপো তথা তৃণমূলের ‘যুবরাজ’ও চেয়েছিলেন মঞ্জুদেবীকেই নোয়াপাড়ার উপ-নির্বাচনে প্রার্থী করতে৷ কিন্তু দলের প্রাক্তন ‘ক্রাইসিস ম্যানেজার’এর ম্যাজিক রুখতে পুজোর সময় থেকেই মুকুল রায়ের সঙ্গে সমান টক্কর দিতে দল ময়দানে নামিয়েছিল ভাটপাড়ার দাপুটে বিধায়ক অর্জুন সিংকে৷ এলাকায় সংগঠন ধরে রাখতে এবারে প্রার্থী বাছাইয়ের দায়িত্বও বর্তেছিল তাঁরই কাঁধে৷ফলে অভিষেক নয়, দলের ‘বৃহত্তর স্বার্থে’র কথা ভেবে অর্জুনের ‘ইচ্ছে’কেই স্বীকৃতি দিয়েছেন স্বয়ং দলনেত্রী৷

আর এখান থেকেই পাহাড় প্রমাণ ক্ষোভ তৈরি হয়েছে মঞ্জুদেবীর মতো ‘আদি’ তৃণমূলীদের মধ্যে৷‘আদি’ তৃণমূলীদের এহেন বিন্দু বিন্দু ক্ষোভকে একত্রিত করে ভোটের ময়দানে বাজিমাত করতে আসরে নেমেছেন স্বয়ং মুকুল রায়৷ লক্ষ্মীবারের সন্ধেয় বাড়ি বয়ে গিয়ে দেখা করে এসেছেন বিকাশবাবুর স্ত্রীর সঙ্গে৷ গেরুয়া টিকিটে নোয়াপাড়ার উপনির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে তাঁকে৷ যদিও বিষয়টি নিয়ে এখনও দোলাচলে মঞ্জুদেবী৷

ফোনের অপরপ্রান্তের কন্ঠ শুনেই বোঝা যাচ্ছিল শারীরিকভাবে তিনি অসুস্থ৷ নিজেই সেকথা জানিয়ে ধরা গলায় বললেন, ‘‘বিজেপির তরফে প্রার্থীপদের প্রস্তাব এসেছে৷ তবে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিইনি৷’’ কথায় কথায় ফিরে যান প্রায় ২০ বছর আগের স্মৃতিতে৷ এক নাগাড়ে বলতে থাকেন, ‘‘‘‘তখন সিপিএমের প্রবল পরাক্রম৷ তারই মাঝে আমরা সপরিবারে এলাকায় সংগঠনটাকে ধরে রেখেছিলাম৷ দলেরই একাংশের হাতে স্বামীকে খুন হতে হল৷ তারপরও দলের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিইনি৷ অথচ প্রথমদিন থেকে দল করার পরিণাম আজ দলই আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল!’’

তাঁকে প্রার্থী করা তো হয়ইনি, এমনকি এবিষয়ে গত বুধবার পলতায় দলের প্রকাশ্য নির্বাচনী সভাতেও ডাকা হয়নি তাঁকে৷ স্বভাবতই দলনেত্রী প্রসঙ্গে ঘনিষ্ঠ মহলে তীব্র ক্ষোভ উগড়ে মঞ্জুদেবী বলছেন, এখন দলের সুসময়৷ দিদিমণির কি আর অত সময় আছে, যে সবকিছু চোখ দিয়ে দেখবেন আর কান দিয়ে শুনবেন! বোধহয়, এখন উনি চোখ দিয়ে শোনেন আর কান দিয়ে দেখেন৷ তা না হলে আমাদের মতো আদ্যান্ত তৃণমূলীরা কিভাবে বঞ্চিত হই?

মঞ্জুদেবী একা নন৷ পালাবদলের বাংলায় ‘নব্য’ তৃণমূলীদের দাপটে তিল তিল করে ক্ষোভ বাড়ছে ‘আদি’ তৃণমূলীদের অন্তরে৷ বিন্দু বিন্দু করে তৈরি হওয়া সেই ক্ষোভকে সিন্ধুতে পরিণত করতে বাংলার মাঠে-ঘাট চষে বেড়াচ্ছেন গেরুয়া জার্সিধারী মুকুল রায়৷ অভিষেক ঘনিষ্ঠ এক তৃণমূল নেতার কথায়, ‘‘সবংয়ের নির্বাচনে ‘কংগ্রেসী’ মানস ভুঁইয়ার স্ত্রীকে প্রার্থী করা নিয়ে আদি তৃণমূলিদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে৷ একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি নোয়াপাড়ায় হোক, তা চাইনি অভিষেক৷ কিন্তু মুকুল রায়ের মতো দক্ষ সংগঠককে এলাকায় রুখতে অজুর্নের মতো দাপুটে নেতার উপর আস্থা না রেখে উপায় ছিল না৷’’

ক্ষোভের ফসলকে ভোট বাক্সে নিয়ে যেতে মরিয়া মুকুল রায়৷ মুচকি হেসে বলছেন- ‘‘অপেক্ষা করুন৷ শীঘ্রই নোয়াপাড়া আসনে আমরা প্রার্থীর নাম ঘোষণা করব৷’’ রহস্য জিইয়ে রেখে তাঁর বাড়তি সংযোজন, ‘‘প্রার্থীপদে চমক থাকবে, এটুকু এখন থেকেই জানিয়ে রাখছি৷’’

ঘরে ভাঙনের খেলায় নেমেছেন মুকুল রায়৷তা রুখতে জেলায় জেলায় ছুটছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়৷ঝরাচ্ছেন ঘাম৷ তবু নিশ্চিত হওয়ার জায়গা কই?- বলছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা৷

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ