শংকর দাস, বালুরঘাট: পৌষপার্বণে পিঠেপুলির স্বাদ পেতে মিক্সচার গ্রাইন্ডার ও ধান গম ভাঙানোর মেশিনের চেয়ে কদর ঢেঁকিরই বেশি। বছরের আর দশটা দিন এর কথা কেউ মনে না রাখলেও, পৌষমাস আসলেই সকলে এক সময়কার গ্রামীণ কুটির শিল্পের অন্যতম প্রতীক এই ঢেঁকিতেই বেশি নির্ভরশীল হন।

কারণ, পৌষপার্বন মানেই যে পিঠে পুলির উৎসব। আর এই পিঠেপুলির অন্যতম উপকরণই হল চালের গুঁড়ো। বর্তমানে কলে মেশিনে ভাঙানো চালের গুড়ো দিয়েই সকলে পিঠে পুলি ও অন্যান্য সুস্বাদু খাবার বানালেও, গ্রামগঞ্জের বয়স্কাদের মতে পিঠেপুলির প্রকৃত স্বাদ পেতে হলে ঢেঁকিতে কুটা চালের আটাই ছাড়া তা সম্ভব না। যে কারণে, পৌষ সংক্রান্তির দিন আসতেই গ্রামগঞ্জের অধিকাংশ বাড়ি গুলিতে থেকে ঢেঁকিতে চাল গুঁড়ো করার শব্দ ভেসে আসতে শুরু করে।

শীতের মরশুম মানেই পৌষ পার্বন ও পিঠেপুলি উৎসব। এই সময়ে পিঠেপুলি হয় না বাংলায় বিশেষ করে মফস্বল তথা গ্রামীণ এলাকায় এমন বাড়ি একটিও হয়ত পাওয়া যাবে না। সুস্বাদু পিঠেপুলি কথা উঠলেই সবার আগে যে বস্তুটি স্মরণে আসে তা হলো ঢেঁকি। গ্রামের বাড়ি গুলিতে বছরের আর দশটা সময় বাড়ির এক কোনায় অযত্নে অবহেলায় পড়ে থাকলেও পৌষপার্বণ আসতেই সুস্বাদু পিঠেপুলি খাওয়ার লোভে এর কদর বা আদর দুই চোখে পড়ে।

একটা সময় গ্রাম বাংলার অর্থনীতিতে ঢেঁকির গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা ছিল। ধান ও কলাই ভাঙিয়ে চাল ডাল হলুদ সমস্ত কিছুই করা হত এই ঢেঁকি দিয়ে। শুধু অর্থনীতিতেই নয় বাড়ির উঠোনে বা বারান্দায় ঢেঁকি থাকবে না গ্রাম বাংলায় তা ভাবাই যেত না। গ্রামের ছবি ভাবলেই মেঠো পথ তাল ও খেজুর গাছ। গরুর গাড়ি আর ঢেঁকির ছবিটাই চোখের সামনে ফুটে উঠত।

আধুনিক ইলেকট্রনিক্স যুগে মিক্সার মেশিন ও হাস্কিং মিল-এর সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে ঢেঁকি আজ বিলুপ্তপ্রায়। গ্রামাঞ্চলে বর্তমানে হাতে গোনা কয়েকটি বাড়িতে ঢেঁকি থাকলেও তা দিয়ে সারা বছর কোনও কাজ আর করা হয়না। কিন্তু, পৌষপার্বনের পিঠেপুলির সময় আসতেই তার ব্যবহার হয়ে থাকে। ষাটোর্ধ্ব রেণুবালা দাসের মতে, মেশিনে গুঁড়ো করা চালের আটার চাইতে ঢেঁকিতে কুটা চালের গুড়ো দিয়ে তৈরী পিঠে বেশি ফুলে ওঠে। সেই পিঠে পুলি ও পাটিসাপ্টার স্বাদও অনেক গুন্ বেশি হয়। তিনি একথাও জানিয়েছেন যে, ঢেঁকির চালের আটা সামান্য দানাদার হয়ে থাকে। যা মেশিনে গুঁড়ো করা চালের আটাতে থাকে না। তাই পিঠেপুলি খাওয়ার এই মরশুম আসতেই হারিয়ে যেতে বসা ঢেঁকির কদর কিছুটা হলেও চোখে পড়ে বলে জানিয়েছেন তিনি।

এই বিষয়ে শিক্ষক কৌশিক বিশ্বাস জানিয়েছেন, শুধু পিঠেপুলির ক্ষেত্রেই নয়। একটা সময় গ্রাম বাংলার বিয়ের উৎসবে গায়ে হলুদ ছিল অন্যতম পর্ব। মহিলারা সকলে মিলে ঢেঁকিতে হলুদ কুটে তা পাত্রীর গায়ে মাখিয়ে দিতেন। কিন্তু পরবর্তীতে ঢেঁকির ব্যবহার কমে যাওয়ায় লোহার হামানদিস্তা সেই জায়গায় দখল করে নেয়। আর কিছু না হোক বাঙালির পৌষপার্বনের দৌলতে অন্তত এখনও বেঁচে রয়েছে ঢেঁকি।