সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : করোনা নিয়ে বারবার আঙুল উঠেছে চিনের দিকে। বারবার বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠছে যে চিন কি কিছুই জানত না? অজান্তে এমন ভাইরাস তারা কীভাবে অর্থনীতির খুঁটি শক্ত রেখে মোকাবিলা করল? তবে কি তৃতীয়বিশ্ব যুদ্ধটি চলছে এই ভাইরাস প্রয়োগের মাধ্যমে যা জৈবাস্ত্র?

এবং এর মূলে কি সেই দেশই। চিন সরকার ছাড়া সারা বিশ্ব আপাতত চিনের দিকেই আঙুল তুলেছে এবং বলা হচ্ছে তারা জৈবাস্ত্র প্রয়োগ করেছে। যদি বিশ্বের অভিযোগ মেনেই চলা হয় তাহলে এটাই কি প্রথম ‘যুদ্ধ’ যেখানে জৈবাস্ত্র প্রয়োগ করা হল? বিখ্যাত পশু চিকিৎস শিবাজি ভট্টাচার্যের তথ্য মাফিক একেবারেই তা নয়।

যেহেতু এটা স্পষ্ট যে করোনা জুনোটিক অর্থাৎ পশুদের থেকে করোনার মতো ভাইরাস মানুষে আসে তাই kolkata24x7 বিশিষ্ট পশু চিকিৎসকের কাছে জৈব অস্ত্রের প্রয়োগ ও এর ইতিহাস জানতে চেয়েছিল। তাঁর গবেষণা অনুযায়ী আমাদের এই বিশেষ প্রতিবেদন।   

পশু চিকিৎসক শিবাজি ভট্টাচার্য জানাচ্ছেন , ‘যুদ্ধ জয়ের জন্য বহু শতক আগেই পারসিক, গ্রীক এবং রোমানরা অতি সংক্রামক রোগ সুকৌশলে ছড়িয়ে দিত বিপক্ষ শিবিরে মহামারী ঘটানোর উদ্দেশ্যে। বিভিন্ন ইউরোপীয় যুদ্ধে, ঊনবিংশ শতাব্দীতে আমেরিকার গৃহযুদ্ধে এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বোয়ের যুদ্ধেও বিভিন্ন জৈব যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। শত্রু শিবিরে খাদ্য ও জলের জোগান বন্ধ করে দিয়ে ভয়ঙ্কর সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে দেওয়া বহু দিন যাবৎ যুদ্ধ পরিকল্পনার অঙ্গ।

তখনকার দিনে রোগ জীবাণু সম্বন্ধে বিস্তারিত না জানলেও সেই সকল রোগের মারণ ক্ষমতা সম্বন্ধে তারা যথেষ্ট ওয়াকিবহাল ছিল, তাই বহু ক্ষেত্রেই প্লেগ ও গুটি বসন্তে আক্রান্ত মৃতদেহগুলিকে তারা দুর্গপ্রাকার বা শহরের উঁচু দেওয়াল পার করে ভিতরে ফেলে দিত। ফলে মহামারী ছড়িয়ে যেতে সময় লাগতো না। যুদ্ধ জয় হত সহজতর।’

ইংল্যাণ্ড , জাপানের মতো দেশগুলি আজ জৈব যুদ্ধের বিরুদ্ধে সরব। তাঁরাও অতীতে এই কান্দ ঘটিয়েছে। ইতিহাস তার সাক্ষী আছে। শিবাজি ভট্টাচার্য জানাচ্ছেন, ‘আমেরিকার রেড ইণ্ডিয়ানদের উপর প্রভুত্ব করার বাসনায় ১৭৬৫ সালে ব্রিটিশ বাহিনীর সর্বাধিনায়ক স্যার আমহার্স্ট কোন এক চুক্তি মোতাবেক তৎকালীন রেড ইণ্ডিয়ান সর্দারদের কাছে ভয়ানক স্মল পক্সের জীবাণু দূষিত অনেক কম্বল ও রুমাল পাঠিয়েছিলেন তার অফিসার মারফৎ। সরলচিত্তে তা গ্রহণ করে বিতরণ করার অব্যবহিত পরেই সেই রোগ রেড ইণ্ডিয়ান উপজাতিদের মধ্যে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল এবং নিয়ে গেল ষাট লক্ষ মানুষের জীবন।’

জাপানের জৈবাস্ত্র প্রয়োগ নিয়ে তিনি জানাচ্ছেন, ‘জীবাণুকে যুদ্ধাস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করার জন্য জাপান পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করে ১৯৩১ সালে। এই কাজের জন্য তাদের অধিকৃত চীনের মাঞ্চুরিয়া অঞ্চলের হার্বিন শহরে একটি কেন্দ্র স্থাপন করে। সেখানে প্লেগ, কলেরা, টাইফয়েড, প্যারাটাইফয়েড এবং অ্যানথ্রাক্স প্রভৃতি মহামারী সৃষ্টিকারী রোগের জীবাণু নিয়ে গবেষণা ও যুদ্ধাস্ত্রে পরিণত করার লক্ষ্যে বহু বিজ্ঞানীকে নিয়োগ করা হয়। ঐ সকল পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য গিনিপিগ বানানো হয়েছিল চিন ও রাশিয়ার যুদ্ধবন্দীদের।

ফলে কম করে ১৫০০-২০০০ বন্দীর মৃত্যু হয়েছিল সেই সকল মারাত্মক রোগে। ১২টি চিনা শহরে ব্যাপক হারে ঐ সকল রোগের মহড়া দেওয়া হয়েছিল। তবে ঐসব রোগ নিয়ে নাড়াচাড়া করতে গিয়ে প্রায় ১৭০০ জাপানি মানুষও মারা গিয়েছিলেন কারণ তারা বোতলের দৈত্যকে বার করতে শিখলেও তাকে আবার বোতলবন্দি করতে শেখেনি।’ শিবাজি ভট্টাচার্য জানাচ্ছেন, ‘জাপানের হাল হতে পারে চিনেরও। পাল্টা হাওয়ায় ভাইরাস তাঁদের দিকে এগিয়ে এলে সামলানো কঠিন হবে।’

আমেরিকা , বৃটেন ও রাশিয়াও জৈব যুদ্ধাস্ত্র তৈরীর জন্য অনেক গবেষণা কেন্দ্র ও উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করে। প্রতিযোগিতামূলক ভাবে ইরান, ইরাক, ইজরায়েল, উত্তর কোরিয়া, চীন, লিবিয়া, সিরিয়া, তাইওয়ানের মতো অন্তত ২০টি দেশ নয়া নয়া জৈবাস্ত্র তৈরী করতে চেষ্টা করছে।