সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়: ‘সিপিএমের ‘হার্মাদ বাহিনী’, বাংলার রাজনীতিতে খুব পরিচিত শব্দ। এই শব্দগুচ্ছের নেপথ্যে ছিলেন বর্তমান পত্রিকার প্রয়াত সম্পাদক শ্রী বরুণ সেনগুপ্ত৷ যা লুফে নিয়েছিলেন তৎকালীন বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ যা ক্রমেই ‘প্রবাদ বাক্যে’ পরিনত হয় বিরোধী দলের নেতা, কর্মীদের কণ্ঠে৷ এই ‘প্রবাদ বাক্যের’ সঙ্গেই জড়িয়ে বাম আমলে ‘নন্দীগ্রাম গণহত্যার’ কালো ইতিহাস। কিন্তু এই হার্মাদ আসলে কারা? এখানেও রয়েছে অকথ্য অত্যাচারের কাহিনী। তবে তারা বঙ্গবাসী নয়। তারা পর্তুগীজ এবং জলদস্যু।

‘পর্তুগিজ আর্মাডা’ , এই ‘আর্মাডা’ শব্দ অপভ্রংশ হয়ে লোকমুখে পরিচিত হয় ‘হার্মাদ’ নামে। ষোড়শ-সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বাংলার পূর্ব ও দক্ষিণ সীমান্তে এসে হাজির হয়েছিল আর্মাডারা। মুঘল সাম্রাজ্যের সঙ্গে শত্রুতার জেরে আরাকানের মগ দস্যুরা পর্তুগিজ জলদস্যু বা হার্মাদদের সঙ্গে একযোগ তৎকালীন মুঘলশাসনাধীন বাংলায় অবাধ লুঠতরাজ, অপহরণ ও নারীদের উপর অকথ্য অত্যাচার চালাত। সেই সময় দাস প্রথার ব্যাপক চল ছিল। জলদস্যুরা লুঠতরাজের পাশাপাশি এই দাস ব্যবসাতেও লাভ খুঁজে পেয়েছিল। তাই বাংলার স্থলভূমিতে গিয়েও হার্মাদরা ব্যাপক লুঠতরাজ এবং অকথ্য অত্যাচার চালাত। তারপর পুরুষ মহিলা নির্বিশেষে অপহরণ করে দাক্ষিণাত্যের বিভিন্ন বন্দরে বণিকদের কাছে গিয়ে বিক্রি করে দিত। এক সময় দস্যুদের ভয়ে বাংলার সমুদ্রতীরবর্তী দ্বীপ অঞ্চল জনশূন্য হয়ে গিয়েছিল।

মহম্মদ আলি চৌধুরীর বিভিন্ন লেখা থেকে জানা যায় , সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বাংলার উপকূলীয় এলাকায় ‘মগ ফিরিঙ্গিদে’র দৌরাত্ম্য সমাজ জীবনে এক অভিশাপের রূপ নিয়েছিল। সুলতান হুসেন শাহের রাজত্বকালে বঙ্গদেশে সর্বপ্রথম পর্তুগিজ হার্মাদ বণিকদের আবির্ভাব ঘটেছিল বলে জানা যায়। ক্রমে চট্টগ্রাম, সপ্তগ্রাম ও হুগলি এদের বাণিজ্যকেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায়। ওই সময়ে হিন্দু সমাজে নারীদের অবস্থা করুণ হয়ে উঠেছিল। ধর্ষণ, খুন প্রত্যেক দিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল বলে জানা যায়।

মুসলিম ধর্মাবলম্বীরাও এদের অত্যাচারের শিকার হয়েছিল। সন্দ্বীপ নামে একটি অঞ্চলে মুঘল শাসক ফতেহ খাঁ হার্মাদদের ধ্বংস করতে যুদ্ধ জাহাজ নিয়ে অভিযান চালান। নৌ-যুদ্ধে পারদর্শী পর্তুগীজরা তাঁকে সহজেই হারিয়ে দেয়। জলদস্যুনেতা সিবাশ্চিয়ান গঞ্জালিস সন্দ্বীপ দখল করে সেখানকার মুসলমানদের নির্মূল করেছিল বলে জানা যায়। ইংরেজশাসনেও পর্তুগিজ হার্মাদদের দস্যুতার কথা শোনা যায়। ১৭৯০ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ সরকার তৎকালীন হাওড়ার শিবপুরে (এখনকার বোটানিক্যাল গার্ডেনের কাছে) গঙ্গায় বাঁধ তৈরি করে মগ ও পর্তুগিজ দস্যুদের আগমন পথ বন্ধ করার চেষ্টা করেছিল। এত কিছুর পরেও ১৮২৪ সালেও কলকাতাতে এই দস্যুরা হানা দিয়েছিল বলে জানা যায়।

কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী ষোড়শ শতকে চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে হার্মাদ জলদস্যুদের কথা উল্লেখ করে লিখেছেন, ‘শ্রীমন্ত সওদাগরের নাবিকেরা “রাত্রিদিন বাহি যায় হার্ম্মাদের ডরে”।’ বিভিন্ন পল্লীগীতিকায় এদের উল্লেখ মেলে। পর্যটক বার্নিয়ারের ভ্রমণবৃত্তান্তেও জলদস্যুদের অত্যাচার ও লুঠপাটের বিশেষ বিবরণ পাওয়া যায়।

আর সেই হার্মাদ কথাটি নতুন ভাবে বাংলায় উঠে আসে ২০০৭ সালে। পূর্ব মেদিনীপুর জেলার হলদিয়ার কাছে নন্দীগ্রামে তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন বাম সরকারের থেকে ইন্দোনেশীয় সালেম গোষ্ঠী কেমিক্যাল হাব গড়ার বরাত পেয়েছিল। এই উদ্দেশ্যে সরকার ১০ হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করতে চাইলে স্থানীয় মানুষেরা প্রতিবাদ আন্দোলন শুরু করেন। এই আন্দোলন দমনের জন্য সরকার চার হাজারেরও বেশি সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করে। ২০০৭ সালের ১৪ মার্চ পুলিশের সঙ্গে স্থানীয় গ্রামবাসীদের সংঘাত বাঁধলে পুলিশের গুলিতে চোদ্দো জন গ্রামবাসী নিহত হয়েছিলেন।