স্টাফ রিপোর্টার, হলদিয়া: ‘খোকা ইলিশ বিক্রি নাই, বড় ইলিশ কাটছি তাই৷’ ‘ছোট ইলিশ বইতে মানা, পড়লে ধরা জরিমানা’ , ‘খোকা ইলিশ রাঁধতে মানা, ইলিশ পুলিশ দেবে হানা’, ‘বাঁচলে ছোট ইলিশ, মিলবে তবেই বড় ইলিশ’- এমন সব স্লোগানকে সামনে রেখেই সমুদ্রের রুপোলি রানিকে বাঁচাতে তৎপর হল পূর্ব মেদিনীপুর জেলার হলদিয়া মৎস্য দফতর৷

ইলিশ রক্ষায় শুক্রবার হলদিয়া মৎস্য দফতরের উদ্যোগে পদযাত্রা থেকে পথ সভা সবই হল৷ তাৎপর্যপূর্ণভাবে এই সভায় ডাকা হয়েছিল হলদিয়া সহ পার্শ্ববর্তী জেলার মৎস্যজীবী, জেলে থেকে বাড়ির সাধারণ গৃহবধূদের৷ ছিলেন স্থানীয় শিশু শিক্ষা কেন্দ্রের দিদিমনি থেকে পড়ুয়ারাও৷ সবমিলিয়ে প্রায় ৩০০ জন হাজির ছিলেন পথ সভায়৷

হলদিয়ার মৎস্য আধিকারিক সুমন সাহু বলেন, ‘‘শুধু মাছ ধরা নয়, যারা বিক্রি করেন ও যাঁরা রান্না করেন তাঁদের সকলকেই ডাকা হয়েছিল৷ মেয়েরাই তো রান্না করেন, তাই তাঁদেরও ডাকা হয়েছিল৷ প্রত্যেকের কাছে আমরা অনুরোধ জানিয়েছি- ইলিশ আমাদের সম্পদ। নদী-সমুদ্রে এর অবাধ বিচরণ রয়েছে। সরকার ঘোষিত নিষিদ্ধ সময়েও ইলিশ শিকার বন্ধ করা আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব। শুধু ধরাই নয় , ইলিশ মাছ বিক্রি ও কেনা দুটোই নিষিদ্ধ। ইলিশ শিকার রোধে প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ সচেতন ব্যক্তিদের এগিয়ে আসতে হবে৷’’

হলদিয়া মৎস্য দফতরের উদ্যোগে এদিন হলদিয়া বিডিও অফিস থেকে এক বর্ণাঢ্য ব়্যালী বের হয়। সেখানে ইলিশ রক্ষায় বিভিন্ন ব্যানার সহকারে স্থানীয় এলাকার বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে ব্রজলালচক বাজার হয়ে অফিস প্রাঙ্গনে গিয়ে ব়্যালী শেষ হয়। পরে ব্রজলালচক মার্কেটের সামনে এক পথ সভায়ও করা হয়৷ বক্তব্য রাখেন রাজ্যের সহ মৎস্য অধিকর্তা (সামুদ্রিক) রামকৃষ্ণ সর্দার, হলদিয়া ব্লক মৎস্য আধিকারিক সুমন সাহু, হলদিয়া ব্লকের বিডিও রাজর্ষী নাথ, কৃষি কর্মাধ্যক্ষ দেবপ্রাসাদ জানা, জেলা পরিষদের সদস্যা ভক্তি গুমট্যা মাইতি, সুতাহাটা ব্লকের এফ.ই.ও. অলোক রজক, পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি খুকুমনি সাহু প্রমুখ৷

সভায় বক্তারা বলেন, ২৩ সেন্টিমিটারের কম বা ৯ ইঞ্চির ছোট মাপের ইলিশ পরিবহণ, বিক্রি, কেনা বা ধরা নিষেধ।ইলিশ মাছের প্রাকৃতিক ভান্ডার সংরক্ষনের জন্য কোনও ব্যাক্তি বা মৎস্যজীবী বা তাঁদের সহযোগীরা ৯০ মিলিমিটারের কম ফাঁস যুক্ত যেকোনও প্রকারের মনোফিলামেন্ট জাল ব্যবহার করে ইলিশ মাছ ধরতে পারবেন না। অন্যান্য মাছের ক্ষেত্রে ৪০ মিলিমিটারের কম। ইলিশ মাছের প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি করার জন্য বছরে ১৫ই সেপ্টেম্বর থেকে ২৪শে অক্টোবর পর্যন্ত অর্থাৎ ওই সময় পূর্ণিমার ৫ দিন আগে ও ৫ দিন পরের সময় কালে ইলিশ মাছ ধরা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। সামুদ্রিক জীব বৈচিত্র এবং তাদের বাসস্থান সুরক্ষা ও বংশবৃদ্ধির জন্য সমুদ্র উপকূল থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত ইলিশ মাছ সম্পূর্ণ রুপে বন্ধ করা দরকার।

আলোচনা শেষে আলোচনার ওপরেই এক প্রশ্নোত্তর পর্বের আয়োজন ছিল৷ সেখানে সঠিক উত্তরদাতাদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন মৎস্য দফতরের আধিকারিকরা৷ হলদিয়ায় মৎস্য দফতরের এই নতুন অভিনব জনসচেতনতা মূলক প্রচারের উদ্যোগে খুশি এলাকার বাসিন্দারা৷ হঠাৎ কেন এমন উদ্যোগ? মৎস্য আধিকারিকরা জানান, পূর্ব মেদিনীপুর জেলা মূলত নদী প্রবণ জেলা৷ মহিষাদলের গেঁওখালি এলাকায় হুগলি, দামোদর ও রুপনারায়ণ তিনটে নদী এক সঙ্গে মিশেছে বলে সংশ্লিষ্ট এলাকাটিকে বলা হয় ত্রিবেণী সংঘম৷ এছাড়াও এই জেলায় রয়েছে হলদী নদী৷ রয়েছে দীঘা-মন্দারমণির মতো সমুদ্র সৈকতও৷ স্বভাবতই এই জেলা জুড়ে মাছ চাষ প্রচুর পরিমাণে হয়ে থাকে৷

এদিনের আলোচনা সভায় হাজির হওয়া মৎসজীবী সায়ন্তন সামন্ত বলেন, ‘‘ইলিশ বিষয়ে সত্যি সকলের আরও যত্নবান হওয়া দরকার৷ মৎস্য আধিকারিকদের এমন উদ্যোগ সত্যি প্রশংসনীয়৷ অনেক কিছু অজানা জিনিস জানলাম৷ ভালো লাগল৷’’