সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়: সম্প্রতি জুনিয়র চিকিৎসকদের আন্দোলনে রাজ্য প্রশাসনের মাথা ব্যথার কারন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আন্দোলনের ভিত্তি ছিল এনআরএস হাসপাতালে এক সম্ভাবনাময় চিকিৎসকের উপর রোগী পরিবারের হামলা। যার জেরে জুনিয়র ডাক্তার পরিবহ হঠাৎ করে প্রায় মৃত্যুর মুখে পৌঁছে গিয়েছিলেন। চিকিৎসকদের সংগঠন ঘটনার জন্য বারবার আঙুল তুলেছে রাজ্য সরকারের দিকে।

প্রায় ৪০ বছর আগে এই এনআরএসেরই এক বিখ্যাত চিকিৎসকের মৃত্যু হয়েছিল। সাধারণ ডাক্তার নন, ভারতের চিকিৎসাবিজ্ঞানের কার্যত এক নতুন পথ খুলে দিয়েছিলেন তিনি। সেই মৃত্যুর দায় কি কোনোভাবে এড়াতে পারে তৎকালীন রাজ্য সরকার? বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন  ওঠে আজও। বিশ্ববিখ্যাত সেই বাঙালি চিকিৎসক ডঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়।

ভারতের প্রথম এবং বিশ্বের দ্বিতীয় টেস্ট টিউব বেবির জন্ম এই ডঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের হাতে। তাঁর এই পরীক্ষার ফল আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়কে জানাতে চেয়েছিলেন তিনি। অভিযোগ ওঠে, এই ফল জানাতে গিয়ে তিনি বারবার বাধা পান তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের থেকে। শেষে চরম হতাশায় ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জুন এমন এক কালো দিনে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন।

১৯৭৮, ৩ অক্টোবর। ব্রিটিশ বৈজ্ঞানিক প্যাট্রিক স্টেপটো ও রবার্ট জিওফ্রি এডওয়ার্ডস দ্বারা ওল্ডহ্যাম জেনারেল হসপিটালে পৃথিবীর প্রথম নল-জাত শিশু লুইস জন ব্রাউনের জন্ম হয়। এর ঠিক ৬৭ দিন পরে সুচাষ সরকারের গবেষণায় ভারতের প্রথম টেস্ট টিউব বেবির জন্ম হয়। ইতিহাস সৃষ্টি করেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়। শিশুটির নাম রাখেন দুর্গা (কানুপ্রিয়া আগরওয়াল)। কিন্তু আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে তাঁর গবেষণার সম্বন্ধে বক্তৃতা দিতে চাইলে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি দিতে অস্বীকার করে। এই গবেষণার স্বীকৃতি না দিয়ে তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্বাস্থ্যদফতর তাঁর গবেষণার সত্যতা সম্বন্ধে সন্দেহ প্রকাশ করে।

১৯৭৮ সালের ১৮ নভেম্বর পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। বিখ্যাত চিকিৎসকের সুভাষের সমস্ত গবেষণা মিথ্যা বলে রায় দেয় সেই কমিটি। বলা হয়, “Everything that Dr. Mukhopadhyay claims is bogus.”। শাস্তি স্বরূপ তাঁকে তাকে প্রথমে বদলি করা হয় কলকাতার নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ থেকে বাঁকুড়ায়। ‘রিজিওনাল ইনস্টিটিউট অব অপথ্যালমোলজি’-র চক্ষু বিভাগে স্থানান্তরিত করে দেওয়া হয়। স্বাভাবিকভাবেই প্রজনন শারীরবিদ্যা নিয়ে তাঁর সমস্ত গবেষণা বন্ধ হয়ে যায়। তারপর উনি হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁকে বদলি করা হয় কলকাতায়, যেখানে চার তলায় রোজ সিড়ি বেয়ে তাঁকে উঠতে হত।

সরকারি আমলা ও তৎকালীন রাজ্য চিকিৎসক সমাজের এমন ক্রমাগত বিদ্রুপ ও অপমানে হতাশ হয়ে ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জুন কলকাতায় নিজের বাড়িতে আত্মহত্যা করেন। স্ত্রী নমিতা মুখোপাধ্যায় স্কুল থেকে পরিয়ে ফিরে সাউদার্ন এভিনিউয়ের ফ্ল্যাটের দরজা খুলে দেখেন সিলিং থেকে ঝুলছে স্বামী সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মৃতদেহ। সুইসাইড নোটে লেখা ছিল ‘I CAN’T WAIT EVERYDAY FOR A HEART ATTACK TO KILL ME.” বাংলায় যার অর্থ “হার্ট অ্যাটাকের অপেক্ষায় ক্লান্ত দিন যাপন শেষ হোক এবার।”