সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা: দু’জনেই কিংবদন্তি। একজন হকির, অপরজন ক্রিকেটের। দুই কিংবদন্তির দেশ এই মুহূর্তে লড়াইয়ে ব্যস্ত। কিন্তু দুই কিংবদন্তির যখন একই জায়গায় উপস্থিত, তখন কী হয়! তাঁরা কি একে অপরের সঙ্গে দেখা করেছিলেন? আদ্যও কি তাঁদের মধ্যে কোনও কথা হয়েছিল?

দুই কিংবদন্তির একজন হলেন হকির জাদুকর ধ্যানচাঁদ, অপরজন ক্রিকেটের ‘ডন’ স্যার ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান। ডনের দেশ এখন ভারতে হকি বিশ্বকাপের খেলতে ব্যস্ত। আর ধ্যানচাঁদের ভারত অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ব্যাস্ত ক্রিকেট সফরে। বিষয়টা ক্রিসক্রস। হকির জাদুকর ও ডনের সাক্ষাতের ঘটনা আজ থেকে ৮৩ বছরে আগের ব্র্যাডম্যানের হোমটাউন অ্যাডিলেডে।

অ্যাডিলেড ওভালে দু’জনেই উপস্থিত ছিলেন। ডনের দেশে ধ্যানচাঁদ মাঠে খেলছেন হকি। ব্র্যাডম্যান তখন দর্শকের আসনে। ধ্যানচাঁদ এলেন, খেললেন, জয় করলেন। স্টিকের ম্যাজিকে জয় করে নিয়ে ছিলেন কিংবদন্তি ব্যাটসম্যানের হৃদয়। ব্র্যাডম্যান নাকি বলে উঠেছিলেন, ‘ইট ইজ ফ্যাসিনেটিং টু ওয়াচ হিম উইথ আ হকি স্টিকস’। এই কথা শোনা কথা। লোকমুখে ছড়িয়ে যাওয়া। কিন্তু আসল ঘটনাটি কী ছিল? মোহিত ব্র্যাডম্যান ঠিক কী বলেছিলেন ধ্যানচাঁদের খেলা দেখার পর?

১৯৩৫ সালে প্রথম অস্ট্রেলিয়ায় খেলতে যায় ভারতীয় হকি দল। ২ মে ভারতের প্রথম ম্যাচ ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে। অ্যাডিলেডে ভারত জেতে ১০-১ গোলে। ওই ম্যাচের আগে সফরকারী ভারতীয় হকি দলের ম্যানেজার পঙ্কজ গুপ্ত অ্যাডিলেডের মেয়রকে অনুরোধ করেন যদি ব্র্যাডম্যানের সঙ্গে ভারতীয় দলে দেখা করানো সম্ভব হয়। সেই অনুরোধ রেখেছিলেন মেয়র। ব্র্যাডম্যান অ্যাডিলেডের মেয়রের সিটি হলে এসে ভারতীয় হকি দল ও ধ্যানচাঁদের সঙ্গে দেখা করেন। ধ্যানচাঁদের সঙ্গে ছবিও তোলেন। এরপরে সন্ধ্যায় অ্যাডিলেড ক্রিকেট মাঠে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ভারতীয় দলের ওই ম্যাচ দেখেন। সেটাই ছিল ডনের প্রথম হকি ম্যাচ দর্শন। খেলা শেষে ডন ব্র্যাডম্যান ধ্যানচাঁদকে বলেছিলেন, “আমি খেলা দেখে মুগ্ধ।” একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছিলেন, ‘ক্রিকেটে যেভাবে আমরা রান নিয়ে থাকি, তুমি সেভাবে গোল কর।’

এমনভাবেই বহু দেশে খেলতে গিয়েছেন হকির জাদুকর। খেলায় মন জয় করেছেন মানুষের। কখনওবা বিদেশে ব্যাপক উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচ খেলেও তাঁর মনে লেগে থাকা ভারতের ক্লাবস্তরের হকি ম্যাচের কথা তিনি জানিয়েছেন ঘনিষ্ঠমহলে। যেমন ১৯৩৬-এর বার্লিন অলিম্পিক হকিতে ভারত প্রথম ম্যাচ জেতার পর জার্মানির বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় হেডলাইন হয়েছিল, ‘অলিম্পিক কমপ্লেক্স ম্যাজিক শো শুরু করেছে’। এমনকী, বার্লিন শহর পোস্টারে ঢেকে গিয়েছিল— ‘ভারতীয় ম্যাজিশিয়ান ধ্যানচাঁদের খেলা দেখতে হকি স্টেডিয়ামে আসুন’।

আবার ১৯২৮ আমস্টারডাম অলিম্পিকে ধ্যানচাঁদ সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন। ১৪টি গোল করেছিলেন। ভারতের এত বড় সাফল্য নিয়ে এক সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়, ‘এটি হকি ছিল না, ছিল জাদু৷ আর জাদুকর ছিলেন ধ্যানচাঁদ।’ মনে করা হয়, তখন থেকেই ধ্যানচাঁদ ‘হকির জাদুকর’ নামে পরিচিত হয়েছিলেন।

পূর্ব আফ্রিকায় খেলতে গিয়ে তাঁর জীবনের সেরা ম্যাচের স্মৃতিচারণা করে ধ্যানচাঁদ বলেছিলেন, “কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, আপনার জীবনে সেরা ম্যাচ কোনটি? নির্দ্বিধায় বলব, ১৯৩৩-র বেটন কাপ ফাইনালে ক্যালকাটা কাস্টমস বনাম ঝাঁসি হিরোস ম্যাচ।”