সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, হাওড়া: ‘ইকির মিকির চাম চিকির, চামে কাটা মজুমদারদার, ধেয়ে এল দামোদর’। জগন্নাথ নয়, সেই ধেয়ে আসা দামোদরই রথে চড়ে মাসির বাড়ি যাবেন।

নদীমাতৃক দেশে যে গ্রামের জন্ম দামোদরের বুক থেকে সে গ্রামে রথের দিনে জগন্নাথ রূপে গ্রামের মানুষের কাছে যেন হাজির হন দামোদর। তিনিই রথে চড়বেন। তাঁরই পুজো হবে দিনভর। আনন্দ উৎসবে মজবে সাধারণ মানুষ। এমন দামোদর উৎসবের গ্রাম হাওড়া জেলার আমতার উদং।

হাওড়া জেলার মানচিত্রে একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম ‘উদং’। দামোদরের বক্ষ থেকে উত্থিত এই গ্রাম তার শিক্ষা-সংস্কৃতির জন্য প্রাচীনকাল থেকেই বিখ্যাত। গ্রামে বসবাসকারী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে সুদৃঢ় করতে আজ থেকে প্রায় শতাধিক বছর পূর্বে পবিত্র রথযাত্রা উৎসবের সূচনা হয় দাতারাম কাঁড়ারের হাত ধরে।

শতবর্ষপ্রাচীন সেই ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা আজও চলেছে তার ছান্দিক গতিতে। আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক প্রদীপ রঞ্জন রীত বলেন, “ঘাটশিলা থেকে প্রায় দু’নৌকা কাঠ আনা হয়েছিল তৎকালীন ৩০ ফুটের রথটি নির্মাণের জন্য।সাতদিন ধরে চলতো এই রথযাত্রা উৎসব।বসত মেলা। পার্শ্ববর্তী ৮-১০ টি গ্রামের আবালবৃদ্ধবনিতার পদধূলিতে আজও মুখর হয়ে ওঠে এই মিলন মেলা প্রাঙ্গণ।রথটি উদং বাজার থেকে উদং মনসাতলা পর্যন্ত টানা হতো। পরবর্তীকালে অবশ্য সময়াভাবে মেলা দু’দিনেই(প্রথম রথ ও উল্টোরথ)সীমাবদ্ধ হয়।তার সাথে সংক্ষিপ্ত হয় রথের যাত্রাপথও।”

বর্তমানে এই রথযাত্রা উৎসবের প্রধান সংগঠক শ্যামসুন্দর কাঁড়ার জানান, “এই রথের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল,জগন্নাথ-বলরাম-শুভদ্রা নন,রথে চেপে যাত্রা করেন কাঁড়ার বাড়ির আরাধ্য দেবতা ‘দামোদর’।

পূর্বপাড়ার কাঁড়ার বাড়ির বহুপ্রাচীন মন্দিরে তিথি অনুসারে দামোদরের পূজার্চনা পর ঢাকঢোল, কীর্তন, পালকি, সহযোগে কাঁড়ার বাড়ির মন্দির থেকে ‘দামোদর’-কে রথে আনার এই প্রক্রিয়া সাবেকীয়ানার বিশেষ পরিচয়বহ। প্রয়াত মনোরঞ্জন কাঁড়ার, প্রয়াত মদনমোহন কাঁড়ার ও শ্যামসুন্দর কাঁড়ারের হাত ধরে এই রথযাত্রা আমতা থানার অন্যতম সাবেকী রথযাত্রা রূপে জনমানসে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছে।

উদং গ্রামের ঐতিহ্যশালী পুরানো বৃহদাকার কাঠের রথটি বিভিন্ন কারণে নষ্ট হয়ে গিয়েছে। তবে স্মৃতি হিসাবে রয়ে গিয়েছে পুরানো রথের সুবিশাল চাকা ও তার কিছু অংশ। বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে তৈরি হয় লোহার তৈরি রথ। যেটি উত্তর চব্বিশ পরগণার শ্যামনগর থেকে তৈরি করে আনা হয়েছিল। নতুন রথে স্থান পেয়েছে পুরানো কাঠের রথের সারথি ও গড়ুল।

কাঁড়ার বংশের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বিভিন্ন প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এগিয়ে চলেছে শতাব্দীপ্রাচীন এই উৎসব।শ্যামসুন্দর বাবু আরও বলেন, “এই মেলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য যে,মেলায় যোগদানকারী ব্যবসায়ীদের থেকে কোনো অর্থ নেওয়া হয় না। সমস্ত ব্যয়ভার বহন করেন কাঁড়ার বংশ। মেলার অন্যতম আকর্ষণ ছিল ঢাকঢোল সহযোগে লাঠিখেলা। নওপাড়া ও মহিষামুড়ির পোড়খাওয়া লাঠিয়ালদের খেলা দেখতে বহু উৎসুক মানুষ ভিড় জমাতেন মেলায়।

স্থানীয় বাসিন্দা পেশায় শিক্ষক দুর্বাদল ভৌমিকের কথায়, “রথযাত্রা উৎসবকে কেন্দ্র উদং বাজার ও তৎসংলগ্ন অঞ্চল দু’দিন আনন্দভূমির রূপ পরিগ্রহ করে। কালের নিয়মে আজ হয়তো সেই আভিজাত্য-গৌরবে কিছুটা হলেও ভাটা পড়েছে কিন্তু শতবর্ষ অতিক্রান্ত এই গ্রামীণ রথযাত্রা উৎসব ধর্মীয় উৎসবের ঊর্ধে উঠে সামাজিক মহামিলনোৎসবের রূপ নিয়েছে।”

আরও এক স্থানীয় বাসিন্দা পৃথ্বীশরাজ কুন্তীড় কথায় , “এই রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে উদং বাজারে প্রতিবছর প্রায় ৫০-৬০ টি দোকান হয়,জিলিপি-পাঁপড়-খেলনা-মুখোরোচক খাবার-হস্তশিল্প-গাছের পসরা সাজিয়ে বসেন বিক্রেতারা। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে কয়েকশো মানুষ শতবর্ষপ্রাচীন এই রথের রশিতে টান দেন।মেলাজুড়ে মানুষের ঢল নামে।”

রথ টানার পর, সুসজ্জিত পালকিতে চড়ে ঢাক-ঢোল-কীর্তন-আতসবাজি-মশাল সহযোগে কাঁড়ার বাড়ির মন্দিরে যাত্রা করেন আরাধ্য দেবতা ‘দামোদর’।তারপর চলে পূজার্চনা,উলটোরথের দিন সান্ধ্যকালীন পূজার্চনা দামোদরদেবকে পুকুর কেটে স্নান করার প্রাচীন রীতি আজও প্রচলিত।