বর্ধমান: তৃণমূল কংগ্রেসের আমলেই ফের জমি নিয়ে আন্দোলনে নামলেন ক্ষুব্ধ চাষিরা। জোর করে জমি অধিগ্রহণ করে সেখানে মিষ্টি হাব তৈরির চেষ্টার প্রতিবাদে আন্দোলনে নেমেছিলেন কৃষকরা৷ স্থানীয়দের বিদ্রোহের ভয়ে প্রশাসন পিছিয়ে আসার জের কাটতে না কাটতেই ফের আবার সেই একই জমিতে আইটি হাব তৈরির উদ্যোগ নেবার ঘটনায় নতুন করে উত্তেজনার পারদ চড়তে শুরু করল বর্ধমানের আলিশা মৌজার সাঁওতালপাড়ার পটলডাঙা এলাকায়।

রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর খোদ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ ছিল কোনোভাবেই জোর করে অনিচ্ছুক কৃষকদের কাছ থেকে জমি নেওয়া হবে না। কিন্তু অভিযোগ, মুখ্যমন্ত্রীর সেই নির্দেশ মানা হচ্ছে না দফায় দফায় বর্ধমানের আলিশা মৌজার এই সাঁওতাল পাড়ার পটলডাঙা এলাকায়। গতবছরই এই এলাকায় জোর করে বর্ধমান উন্নয়ন সংস্থা অনিচ্ছুক চাষিদের জমিতে মুখ্যমন্ত্রীর স্বপ্নের প্রকল্প মিষ্টি হাব নির্মাণ করতে গেলে তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। জোড়ালো আন্দোলনে নামেন এলাকার চাষিরা।

কার্যত সিঙ্গুর আন্দোলনের ঢঙে ভেঙে ফেলা হয় জমির সীমানা। বিষয়টি মুখ্যমন্ত্রীর নজরে আসতেই তিনি জানিয়ে দেন, জোর করে অনিচ্ছুক চাষিদের জমি দখল করা হবে না। কার্যত এরপরই পিছিয়ে যায় বিডিএ। মিষ্টি হাব তৈরি হয় বর্ধমান জেলা পরিষদের অধীনে থাকা অন্য জমিতে। কিন্তু আবার সেই চাষিদের জমিতেই রাতারাতি আইটি হাব তৈরির বোর্ড লাগানোয় নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। এলাকার চাষি কার্তিক ঘোষ, অমর ঘোষ, অনিল ঘোষ, স্বরূপ ঘোষ প্রমুখরা জানিয়েছেন, ২০০২ সালে এই এলাকার প্রায় ৮০ জন চাষির সাড়ে দশ একর চাষের জমি কার্যত চাষিদের কোনোরকম সম্মতি ছাড়াই জোর করে অধিগ্রহণ করে তত্কালীন বর্ধমান উন্নয়ন সংস্থার বাম পরিচালিত বোর্ড।

দীর্ঘদিন ধরে কিভাবে চাষিদের সম্মতি ছাড়া ওই জমি বিডিএ অধিগ্রহণ করল তা নিয়ে শুরু হয় চাপান উতোর। এরই মাঝে ২০১৬ সালে মুখ্যমন্ত্রীর ইচ্ছায় বর্ধমানে মিষ্টি হাব তৈরির জন্য জমি খোঁজার কাজ শুরু হয় এবং আলিশা মৌজার এই পটলডাঙার জমিকেই বাছা হয়। শুরু হয় জমিতে নির্মাণ কাজও। আর এই ঘটনাতেই রীতিমত ক্ষুব্ধ ও বঞ্চিত এলাকার চাষিরা সিঙ্গুর আন্দোলনের ঢঙে শুরু করেন আন্দোলন। মুখ্যমন্ত্রীর নজরে আসার পর সরিয়ে ফেলা হয় মিষ্টি হাবের কাজ।

এরপর চাষিরা কিছুটা স্বস্তি পেলেও যেহেতু বাম আমলে তাঁদের না জানিয়েই বিডিএ-এর নামে ওই জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল তাই তাঁরা প্রশাসনের কাছে ওই জমি ফিরে পাবার আবেদনও জানান। এদিকে, এরই মাঝে কালীপুজোর দুদিন আগে আচমকাই বিশাল পুলিশ বাহিনী নিয়ে ওই জমিতেই প্রস্তাবিত আইটি হাবের প্রকল্প তৈরির জন্য বোর্ড লাগায় বিডিএ। আর তারপরেই নতুন করে সৃষ্টি হয়েছে উত্তেজনা। এলাকার চাষিরা জানিয়েছেন, কয়েকদিনের মধ্যেই এলাকার চাষিরা সমবেতভাবে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে এব্যাপারে দরবার করতে যাচ্ছেন।

চলতি সময়ে ওই জায়গার কাঠা প্রতি বাজার দর প্রায় দশ লক্ষ টাকারও বেশি। কিন্তু তারা খবর পেয়েছেন ২০০২ সালে যখন তাদের না জানিয়ে জমি অধিগ্রহণ করা হয়, সেই সময় মাত্র ২০ হাজার টাকা কাঠা প্রতি দর দিতে চেয়েছে বিডিএ। কিন্তু চাষিরা তাতে রাজী নন। বুধবার এলাকার ক্ষুব্ধ চাষিরা জানিয়েছেন, জমি অধিগ্রহণের এই ঘটনায় গত ১০ বছর ধরে তাদের চাষ বন্ধ। চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তার ওপর জোর করে ফের তাদের জমি অধিগ্রহণ করা হলে তারা জমিতেই আত্মাহুতি দেবেন। চাষিরা জানান, বিডিএ ওই জমি অধিগ্রহণের সময় সেই সময় বামপন্থী মানসিকতা সম্পন্ন কয়েকজন হাতে গোণা চাষি জমি অধিগ্রহণের নোটিশ গ্রহণ করেন এবং শোনা যায় কয়েকজন ক্ষতিপূরণের টাকাও নেন।

কিন্তু কার্যতই সিংহভাগ চাষিই এব্যাপারে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রয়ে গেছে। কারণ কখন এবং কিভাবে চাষিদের সম্মতি বা অসম্মতি ছাড়া সরকারীভাবে জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে সে ব্যাপারে কিছুই জানানো হয়নি চাষিদের। গোটা প্রক্রিয়াকেই সম্পূর্ণ অবৈধ বলে দাবী করেছেন চাষিরা। এদিন তাঁরা জানিয়েছেন, যদি আইটি হাবের জন্য তাঁদের জমিই প্রয়োজন হয়, তাহলে সরকারকে চলতি বাজার দর অনুযায়ী উপযুক্ত দাম যেমন দিতে হবে তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের পরিবার পিছু একজনকে চাকরীও দিতে হবে। অন্যথায় তারা কিছুতেই জমি দেবেন না।

প্রয়োজনে নিজ নিজ জমিতে দাঁড়িয়েই তাঁরা আত্মাহুতি দেবেন। এদিকে, এব্যাপারে এদিন বিডিএ-র ভারপ্রাপ্ত সিইও প্রবীর চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ওই জমি সরকারী নিয়ম মেনেই অধিগ্রহণ করা হয়েছে। জমির ক্ষতিপূরণের টাকা বিডিএ-তে রয়েছে। চাষিরা মনে করলেই তা নিতে পারেন। তিনি জানিয়েছেন, রাজ্য সরকারের তথ্য প্রযুক্তি দপ্তরের পক্ষ থেকে তাদের কাছে জমি চাওয়া হয়েছিল। তারা এব্যাপারে একটি রিপোর্ট দিয়েছেন। এরপরই জমির ফেন্সিং-এর কাজ শুরু হবে। তারপর সরকারী নির্দেশ মত কাজ করা হবে। তবে চাষিদের ক্ষোভের কথা তিনি কিছু শোনেননি বলে জানিয়েছেন।