জামালপুর(পূর্ব বর্ধমান)- অবশেষে চাঞ্চল্যকর মহিলা আইনজীবী খুনের ঘটনায় দুজনকে গ্রেফতার করল পুলিশ। সেই সঙ্গে এই রহস্যজনক মামলার কেস ফাইল তৈরিতে সাফল্য।

গত ২৭ অক্টোবর পূর্ব বর্ধমানের আঝাপুরে রক্তাক্ত মিতালী ঘোষের দেহ ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়ায়। দোষীদের গ্রেফতারের দাবিতে পশ্চিমবঙ্গ ও আন্দামান-নিকোবরের আইনজীবীরা কর্মবিরতি পালন করেন।

পূর্ব বর্ধমান জেলা পুলিসের দাবি, ধৃত প্রশান্ত ক্ষেত্রপাল ও সুজিত ঘোড়ুই মহিলা আইনজীবী খুনে সরাসরি জড়িত। রবিবার ধৃতদের নিয়ে সাংবাদিক বৈঠক করেন জেলা পুলিশ সুপার ভাস্কর মুখোপাধ্যায়।

এদিকে ধৃত সুজিতের আত্মীয়রা জানিয়েছেন, মিতালীদেবী সুজিতকে খুবই স্নেহ করতেন। সম্প্রতি সুজিত বিজেপি পার্টিতে নাম লেখায়। এর পরেই তার প্রচুর টাকা রোজগার করার নেশা তৈরি হয়েছিল। সেই কারণে মিতালী দেবীর বাড়িতে চুরি করার পরিকল্পনা করে বলে তাদের মনে হচ্ছে। আঝাপুরে সুজিতের প্রতিবেশীদের মধ্যে আতংক দেখা দিয়েছে।

পূর্ব বর্ধমানের জেলা পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, ২৭ অক্টোবর আইনজীবী মিতালী খুনের ঘটনার পর তদন্তের জন্য বিশেষ টিম তৈরি করা হয়।তদন্তে উঠে আসে, বহিরাগত নয় বরং মিতালী দেবীর পরিচিত কেউ এই খুনে জড়িত। যেভাবে হাত পা বেঁধে মহিলাকে খুন করা হয়েছে। সেই সূত্র ধরে চলে অনুসন্ধান। তদন্তে উঠে আসে, পরিচিত কেউ না হলে মিতালীর ঘরের সর্বত্র জানা সম্ভব ছিল না। প্রায় ১০০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

পুলিশ সুপার জানান, এই তালিকায় যেমন আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী পরিজনেরা রয়েছেন তেমনি আইনজীবীরাও রয়েছেন। তদন্ত চলাকালীনই তাঁরা জানতে পারেন – আঝাপুরের দুই বাসিন্দা হঠাৎই বেশি পরিমাণে টাকা খরচ করছে। সন্দেহ হওয়ায় তাদের নজরে রেখে খোঁজখবর নেওয়া শুরু হয়।

প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়ে রবিবার দুপুরে বাঁকুড়ার ইন্দাস থানার মাদ্রা থেকে সুজিত ঘোড়ুই এবং আঝাপুর থেকে প্রশান্ত ক্ষেত্রপালকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই দুজনেরই বাড়ি জামালপুরের আঝাপুরে।

ধৃত সুজিত ডাবের ব্যবসায় যুক্ত। আর প্রশান্ত দিনমজুর। পুলিশ সুপার জানিয়েছেন,মিতালী ঘোষের বাড়িতে গিয়ে ডাব পেড়ে দেওয়ার জন্য সুজিত খুঁটিনাটি তথ্য জেনে নিয়েছিল। এরপরই প্রশান্তের সঙ্গে পরামর্শ করে চুরির উদ্দেশ্যে ঘটনার দিন দুজন মিতালী ঘোষের বাড়িতে হাজির হয়।

পাঁচিল টপকে বাড়িতে ঢোকে সুজিত। ঘণ্টা খানেক সে ধানের মড়াইয়ের পিছনে লুকিয়ে ছিল। তারপর ঢোকে প্রশান্ত। এরপরই এই দুজন শ্বাসরোধ এবং ভারী কিছু দিয়ে মিতালী ঘোষের মাথায় আঘাত করে।

জেলা পুলিশের দাবি, ধৃত দু জনই অপরাধের কথা স্বীকার করেছে। এতে তদন্তের পরবর্তী পদক্ষেপ সুবিধা হবে।

গত ২৭ অক্টোবর সকালে বর্ধমান আদালতের আইনজীবী মিতালী ঘোষের দেহ উদ্ধার হয় তাঁর বাড়িতেই। হাত-পা বাঁধা অবস্থায় আইনজীবীর রক্তাক্ত মৃতদেহ পড়েছিল। সেই খবর পেয়ে জামালপুর থানার পুলিশ জেলার পুলিশ কর্তারা তদন্তে নামেন। ঘটনাস্থল থেকে আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করেন সিআইডি এর ফিঙ্গারপ্রিন্ট এক্সপার্ট। আসে ফরেনসিক টিম

বার কাউন্সিল এবং বার অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিরা পূর্ব বর্ধমানের পুলিশ সুপারের সাথে দেখা করে দোষীদের গ্রেফতারের দাবি জানান। চাপের মুখে পড়ে জেলা পুলিশ।

পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, অপরাধের কথা কবুল করলেও এখনও চুরির কোনও সামগ্রী উদ্ধার হয়নি। ধৃত প্রশান্ত ক্ষেত্রপালের বাবা জানিয়েছেন, তার স্ত্রী পুতুলের কাছে থেকে সোনার হার এবং কিছু টাকা, মোবাইল ফোন বাজেয়াপ্ত করেছে পুলিশ।

ধৃত প্রশান্তর বাবা লক্ষ্মণ ক্ষেত্রপাল জানিয়েছেন, ছেলে বউমার সঙ্গে তাদের ভাল সম্পর্ক ছিল না। তাঁরা স্বামী স্ত্রী আলাদাই থাকতেন। প্রশান্ত কি করে না করে তা তারা জানতেন না।

ধৃত সুজিত ঘোড়ুইয়ের আত্মীয়রা জানিয়েছেন, গতবছর সুজিতকে গাড়ির ব্যাটারি চুরির ঘটনায় গ্রেফতার করা হয়। ১৬দিন জেলও হয়। জেল থেকে ফিরে এসে গাছ থেকে ডাব পেড়ে সে বাজারে বিক্রি করত। সেই সূত্র ধরেই মিতালী দেবীর বাড়িতে সে ডাব পাড়তে যেত।