সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়: দিন দুয়েক আগে ফনী ঝড়ের ভয়ে হাওড়া – পুরী এক্সপ্রেস ট্রেনকে চেন দিয়ে বেঁধে রেখেছিল রেল কর্তৃপক্ষ। এই হাওড়া পুরী রেল চলাচলের সঙ্গে এক বিভীষিকাময় ইতিহাস লুকিয়ে রয়েছে। ঘটনাচক্রে এখানেও মৃত্যুদূত ছিল ঘূর্ণিঝড়, যা ধেয়ে এসেছিল সমুদ্রের উপর। নিয়ে গিয়েছিল প্রায় ৮০০ মানুষের প্রাণ। এর ফলেই কলকাতা পুরী রেল চলতে শুরু করে।

বিশ্বকবি লিখেছিলেন ‘ভগবান তুমি যুগে যুগে দূত পাঠায়েছ বারে বারে , এই দয়াহীন সংসারে’। সত্যি দয়াহীনই বটে, না হলে যারা ভগবানের দর্শন পেতে ছুটে যাচ্ছেন তাঁদেরই ভাগ্যে কি না লেখা মৃত্যু। ভগবানের দেখা নিয়ে ৮০০ পুন্যার্থী অর্জন করতে চেয়েছিল পুণ্য। ভাগ্যে জুটেছিল নির্মম মৃত্যু। সেই সময় গঙ্গাসাগর হোক কিংবা যে কোনও তীর্থক্ষেত্রেই মানুষকে হেঁটেই যেতে হত। বন্যা, ডাকাত, মহামারীর সমস্ত ভয়কে জয় করে মানুষ পুণ্য লাভ করতে যেত। প্রচুর তীর্থযাত্রী পথেই মারা যেতেন। ১৮৭০ সাল কলকাতা-পুরী রেল লাইন তৈরির প্রস্তাব ওঠে।

কারণ সেই সময় থেকেই লাখ লাখ মানুষ জগন্নাথ ধামে যাচ্ছিলেন প্রানের ঝুঁকি নিয়েই। ইংরেজ সরকার তখনও কিছুই করেনি। তৎকালীন একটি জাহাজ সংস্থা কলকাতা থেকে পুন্যার্থীদের নিয়ে যেত চাঁদবালি পর্যন্ত। সেখান থেকে পালকি করে কটক হয়ে পুরী যেতে হত। কিন্তু ওই স্টিমার ছিল বাবুশ্রেনীর জন্য।

১৮৮৭ সালের ২৫ মে স্যার জন লরেন্সে’র ‘ম্যাকলিন এন্ড কো ‘ স্টিমার তৎকালীন উড়িষ্যার চাঁদবালির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল। যাত্রীদের মধ্যে বেশির ভাগই ছিলেন মহিলা। নাবিকদের মধ্যে মাত্র ছয়জন ইংরেজ ছিল। মাঝ পথে শুরু হয় ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড়। ঝড়ে যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যায় স্টিমারের। তারপর স্টিমারের আর কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। দিন দুয়েক পর অন্য কিছু জাহাজ থেকে জানা যায়, গঙ্গার মোহনায় একটি জাহাজের কিছু ভাঙ্গা অংশ তারা পেয়েছে এবং প্রচুর লাশ ভেসে থাকতেও দেখা গিয়েছে।

পরে তৎকালীন ইংরেজ সরকারের পক্ষে জানানো হয়, ‘ঘূর্ণিঝড়ের দাপটে অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে চলা স্যার জন লরেন্স জাহাজটির ডুবে গিয়েছে এবং আরোহী , নাবিক প্রত্যেকে মৃত’। ঘটনার কিছুদিন পর কিছু ইংরেজ মহিলা এই জাহাজডুবিতে নিহতদের স্মৃতি রক্ষার্থে ছোটুলাল ঘাটে বাংলা এবং ইংরেজিতে ফলক স্থাপন করা হয়।

ফলকে লেখা হয়, ” ইং ১৮৮৭ সালের ২৫ মে তারিখের ঝটিকাবত্ত সার জন লারেন্স বাস্পীয় জাহাজের সহিত যে সকল তীর্থযাত্রি জলমগ্ন হইয়াছেন তাহাদিগের স্মরণার্থ কয়েকটি ইংরাজ রমণী কর্ত্তক এই প্রস্তর ফলকখানি উৎসীগৃত হইল।” সেই ফলক এখনও বর্তমান। কলকাতার জগন্নাথ ঘাটে গেলেই দেখা মিলবে সেই স্মৃতি ফলকের।

এই ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়ে যায় তৎকালীন ভদ্রলোক বাবু সমাজে। যেহেতু নিহতদের বেশিরভাগ সমাজের এই অংশের মহিলা ছিলেন তাই শিক্ষিত কলকাতার বাবুরা এই ঘটনার সূত্র ধরে তদানীন্তন ব্রিটিশ সরকারের তুলোধোনা করতে লাগলো অনেকে।বলা হতে লাগলো স্বার্থপর ব্রিটিশরা তাঁদের স্বার্থেই ট্রেন তৈরি করেছে। ভারতবাসীরা মরল কি জন্য ব্রিটিশদের কোনো হেলদোল নেই। পুরী পর্যন্ত রেল সংযোগ থাকলে এই দুর্ঘটনা এড়ানো যেত। তারা এও বলতে লাগলো যে যদি ব্রিটিশ সরকার এই মুহূর্তে পুরীকে রেল মাধ্যমে যুক্ত করার ঘোষণা করে তাহলে ভারতের ১৬ কোটি হিন্দু ব্রিটিশ সরকারের এই দানকে চিরদিন মনে রাখবে।

শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের চাপের কাছে ব্রিটিশ সরকার নতি স্বীকার করে এবং কলকাতা থেকে কটক হয়ে পুরী পর্যন্ত রেল লাইন পাতার কাজ শুরু হয়। ১৮৯৯ সালে কলকাতা থেকে পুরীর রেলপথ জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়।১৯০০ সালের পরে কলকাতা থেকে সরাসরি ট্রেন পুরী যেতে শুরু করে, যার সুবিধা আজও ভোগ করছে মানুষ।