সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়: বসন্ত। প্রেমের সময়। শীতের পাতা ঝড়িয়ে নতুন করে সবুজ পাতা জন্মানোর সময়। এমনই এক বসন্ত , সদ্য কৈশোরে পা দেওয়া ছেলের তখন ভালো করে গোঁফও গজায়নি। বারান্দা থেকে বোমা ছুঁড়ল সেই ছেলেই। মুহূর্তে ‘উড়ে’ গেল ১০০ জন। সে ছেলে বসন্ত বিশ্বাস। পুলওয়ামায় পাক জঙ্গিদের হামলার পালটা যেমন ২৬ ফেব্রুয়ারির ২০১৯-এর ‘১০০০ টন বোমা’। বাঙালি কিশোরের ওই বোমা হামলা যেন ছিল ক্ষুদিরামসহ একাধিক বিপ্লবীর রক্তের পালটা উত্তর।

কলকাতা থেকে ভারতের রাজধানী হিসাবে সদ্য নির্বাচিত হয়েছে দিল্লি। ৫ম জর্জের অভিষেক হয়ে গিয়েছে। জর্জ হার্ডিঞ্জ তখন ইংরেজ শাসিত ভারতের নতুন গভর্নর জেলারেল। তাঁর দিল্লির বাড়িতে তিনি আসবেন সস্ত্রীক। হাতির পিঠে চড়ে। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ছিল তৎকালীন দিল্লির চাঁদনী চক এলাকায়। সব কিছুকে এড়িয়ে বারান্দা থেকে বোমা নিক্ষেপ কিশোর বসন্ত বিশ্বাসের। গভর্নর জেলারেলসহ ব্রিটিশপক্ষের ১০০ জন এক্কেবারে ‘চারো খানে চিত’। মৃত ১, আহত শতাধিক।

ঘটনা ২৩ ডিসেম্বর ১৯১২ সালের। রাসবিহারী বসু অতুল ঘোষের কাছে বোমা চেয়ে পাঠান। চন্দননগরের বোমা বিশারদ মনীন্দ্র নায়েক বোমাটি তেরী করে উত্তরপাড়ার অমরেন্দ্র চ্যাটার্জীর মাধ্যমে দিল্লী পৌঁছে দেন। কিন্তু বোমাটা মারবে কে ? দায়িত্ব নিয়েছিলেন বসন্ত বিশ্বাস। নদীয়ার জেলার ছেলে জ্ঞান বিশ্বাসের বিপ্লবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সস্ত্রীক জর্জ হার্ডিঞ্জ হাতির পিঠে শোভাযাত্রা করে আসছিলেন।

সর্বত্র পুলিশের চর। নজর রাখা হচ্ছিল প্রত্যেকের দিকে। চাঁদদনী চক এলাকার কাছে তখন গভর্নর জেলারেলসহ তাঁর শোভাযাত্রা। ওই এলাকার তিনতলা বাড়িতে দুতলার বারান্দা মহিলাদের জন্য নির্দিষ্ট ছিল শোভাযাত্রা দেখার জন্য। বসন্ত এই সুযোগটাই নিয়েছিলেন। মেয়ের সাজে লীলাবতী নাম নিয়ে বোমাসমেত পজিশন নিয়ে নেন ওই বাড়ির বারান্দায়। হাতি এল,চন্দননগরের তৈরী বোমা কিশোর ছুঁড়ে মারলেন গভর্নর জেলারেলকে লক্ষ্য করে। দুরন্ত নিশানা। বোমার আঘাতে গভর্নর জেলারেল হাতির পিঠ থেকে পড়ে গিয়ে মারাত্মক জখম হন। শোভাযাত্রার হাতি এদিক ওদিক ছুটতে আরম্ভ করে দিয়েছিল। দেশীয় মোসায়েবের দল এলাকা ছেড়ে গায়েব। বোমায় একজন নিহত, জর্জ হার্ডিঞ্জসহ শতাধিক আহত। প্রসঙ্গত এই হামলার ছক ছিল রাসবিহারীর বসুর।

গভর্নর জেলারেলের উপর বোমা হামলা। বৃটিশ মহিলাদের জন্য নির্দিষ্ট ওই বাড়ি এবং বারান্দায় প্রচুর তদন্ত তল্লাশি চালালো। কোনও লাভ হয়নি। খুঁজে পাওয়া যায়নি ‘লীলাবতী’র। প্রায় এক বছর পর বিপ্লবী অমৃত হাজরাকে তাড়া করে তৎকালীন কলকাতার পুলিশ ১৯৬/১ আপার সার্কুলার রোডের বাড়ির অস্ত্রাগার খুঁজে পায়। ধরা পরেন অমৃত হাজরা,দীনেশ দাশগুপ্ত,চন্দ্রশেখর দে,সারদাচারন গুহ,দিল্লীর সেন্ট জোসেফ স্কুলের আমীরচাঁদ,দীননাথ তলোয়ার। কিশোর বিপ্লবী ধরা পড়েন ২ বছর বাদে কৃষ্ণনগর থেকে। পড়ে বিপ্লবীকে ফাঁসি দিয়েছিল ব্রিটিশরা।