দেবযানী সরকার, কলকাতা: প্রযুক্তির দিনবদল, ডিজিটাল-মোবাইল ক্যামেরার দাপটে মৃত্যু স্বীকার করে নিয়েছে এশিয়ার দ্বিতীয় প্রাচীনতম স্টুডিও‘বোর্ন অ্যান্ড শেফার্ড’৷ কিন্তু আধুনিকতার সঙ্গে লড়াই করে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে শহরের এক শতাব্দী প্রাচীন স্টুডিও৷ যে স্টুডিওর ক্যামেরায় ধরা রয়েছে বাঙালির বহু রোমহর্ষক ইতিহাস৷

১৯১৫ সাল৷ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে উত্তাল গোটা দেশ৷ সেইসময় কর্নওয়ালিস রোডে(বর্তমানে বিধান সরণী) শুরু হয়েছিল স্টুডিও ‘ডি রতন অ্যান্ড কোং’। রতন কৃষ্ণ দে ছিলেন স্টুডিওর প্রতিষ্ঠাতা৷ তাঁর নামেই তৈরি হয়েছিল এই স্টুডিও৷ স্বাধীনতার আগে ও পরে তোলা বহু দুর্লভ ছবি রয়েছে ‘ডি রতন অ্যান্ড কোং’আর্কাইভে৷ জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনের অনেক পুরনো ছবি এঁদের কাছে আছে। বাংলা প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি হওয়ার পর নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর একটি গ্রুপ ফটো রয়েছে৷ সুবোধ মল্লিক স্কোয়ারে তোলা সেই ছবিতে তাঁর পাশে ছিলেন মতিলাল নেহেরু৷১৯৪৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেওয়ার ছবি রয়েছে৷ ১ নং গার্ডসিন প্লেস, রেডিও অফিসের ভিতর ছবিটি তুলেছিলেন রতন কৃষ্ণ দের ছোট ছেলে লক্ষ্মীকান্ত দে৷ এছাড়াও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষযাত্রার মুহূর্ত ‘ডি রতন অ্যান্ড কোং’-র ক্যামেরা বন্দি রয়েছে৷একদা ব্রিটিশ আমলে মোহনবাগানের খেলা, তৎকালীন সিএবি ম্যাচের ছবি দেখা যাবে এই স্টুডিয়র আর্কাইভে৷ সাদা-কালো সেসব পোর্ট্রেট ছবি। দামি কেমিক্যাল ও কাগজে প্রিন্ট করা সেই ছবিতে ২০১৯-এ এতটুকু বিবর্ণতার ছোপ ধরেনি৷

রতন কৃষ্ণ দের চতুর্থ প্রজন্ম এখন এই স্টুডিও চালাচ্ছেন৷ তাঁরাই জানালেন এভারেস্ট জয়ের সশরীরে ‘ডি রতন’-স্টুডিওতে এসে ছবি তুলেছেন তেনজিং নোরগে৷ছবি তুলতে এসেছেন রাম ঠাকুর, বিখ্যাত ভাওয়াল সন্ন্যাসী রাজার মতো অনেকেই৷তবে সেসব এখন শুধুই স্মৃতি৷স্টুডিওর কর্ণধার দুই ভাই রাজকুমার দে ও সুমন কুমার দের কথায়, ডিজিটাল আর মোবাইল আসার পর শহরের বনেদি স্টুডিও-ব্যবসা যে ধুঁকছে, একথা সত্যি৷গত তিন-চার বছরে ব্যবসা আরও খারাপ হয়েছে৷ দুই কর্ণধারের বক্তব্য, জিএসটি চালু হওয়ার পর তাঁদের অবস্থা এখন ‘মরার উপর খাঁড়ার ঘা’-এর মতো৷আপাতত বেঁচে থাকার তাগিদে কর্পোরেট থেকে বিয়েবাড়ি, সর্বত্র নিজেদের ছড়িয়ে দিয়েছে তাঁরা।

স্টুডিওর ভারী ক্যামেরা থেকে মুঠোফোনের ক্যামেরা, কয়েক যুগ পেরিয়ে এসেছে ফটোগ্রাফি। সামান্য খরচে, অনায়াসে তোলা যাচ্ছে ছবি। কিন্তু সেই লাল আলো-জ্বলা ডার্করুমের রহস্যময় আবহ আজ কোথায়?-যাঁরা এসব ভেবে নস্টালজিক হয়ে পড়েন তাঁদের জন্যই হয়তো এখনও বেঁচে রয়েছে ‘ডি রতন অ্যান্ড কোং’৷