প্রসেনজিৎ চৌধুরী, রঘুনাথপুর (পুরুলিয়া)ঃ একটুর জন্য বিরাট গোখরো সাপটার সামনে পড়েছিলাম। সরসর করে এঁকে বেঁকে রাস্তা পার হয়ে এক জঙ্গল থেকে অন্য জঙ্গলে চলে গেল নাগরাজ। অবশ্য তার আগে বিছে আর সাপে কিলবিল করা জলাভূমি পেরিয়ে এসেছি। দেখে এসেছি অতীতের গৌরব আশ্চর্য জলাভূমির মন্দির স্থাপত্য তেলকুপী ধংসের শেষ অবস্থায় ধুঁকছে। তেলকুপী, পুরুলিয়ার রঘুনাথপুর থানার অধীন লালপুর গ্রাম লাগোয়া কম বেশি ২০০০ বছরের পুরনো ইতিহাসের খনি।

আর গত দুশো বছর ধরে এক রহস্যময় স্থান। এখানে দিনে রাতে পুটুস ফুলের গন্ধে ম ম করে। ঝিঁঝিঁ ডাকে অবিরত। বর্ষার জলে পরিপূর্ণ হয়ে থাকা পশ্চিমবঙ্গ-ঝাড়খণ্ডের মাঝে বিস্তৃত এক বিশাল পাঞ্চেৎ জলাধার ও দামোদর নদে মিশে থাকা এলাকায় রয়েছে অত্যাশ্চর্য এই স্থাপত্য। দূর থেকেই দেখতে হয় তেলকুপী মন্দির। কারণ মন্দিরের প্রায় পুরোটাই জলের তলায় চলে যায় বর্ষায়। কাদা-মাটি ঘাস জঙ্গলের ওপারটা ঝাড়খণ্ডের ধানবাদ জেলা এপারটা বাংলার পুরুলিয়া। যদিও জলার মধ্যে জেগে থাকা সেই প্রাচীন স্থাপত্যটি পড়ছে বাংলাতেই।

এক নজরে তেলকুপীঃ
⦁ প্রাচীন বাংলার এক সময়ের গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। এখন কালের গর্ভে বিলীন।
⦁ নদী কেন্দ্রিক এক হারানো নগর সভ্যতার কথা লুকিয়ে এখানে।
⦁ প্রাচীন বাংলার অন্যতম শত্রু আক্রমণের প্রবেশ পথ। কিছু বিশেষজ্ঞদের মতে বহুবার এখান দিয়েই বাংলা আক্রান্ত হয়েছে।
⦁ ১৯৫৭ সালে দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশনের বাঁধ নির্মাণের কারণে এলাকার মন্দিরগুলি জলের তলায় চলে যায়।
⦁ বঙ্গ বিহার সংযুক্তি আন্দোলনের বিরোধিতায় মানভূম থেকে কেটে তৈরি হয় পুরুলিয়া জেলা। ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত তেলকুপী পড়ত তৎকালীন বিহারে। (তথ্য ঋণ শিবানন্দ পাল ও অর্ক চৌধুরী, ইতিহাস অনুষন্ধানকারী)

স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই নিষেধ করেছেন মন্দিরের কাছে না যাওয়ার। কারণটা পরিষ্কার, বিষধর সাপের বাসস্থান। শুধু সাপ ! বিছে, জলার বিষাক্ত পোকামাকড়ে কিলবিল করছে এলাকা। তারই মাঝে কাশফুলের বিরাট বিরাট ঘাস বন পেরিয়ে মন্দিরের প্রায় কাছাকাছি গিয়ে দেখা গেল আর যাওয়া সম্ভব নয়। একমাত্র অভিজ্ঞ মাঝি নিয়ে যেতে পারে এই জলভূমির জটিল জলপথ দিয়ে।

কিন্তু এই সময় কেউ সেখানে যেতে চায় না। পুরুলিয়া জেলার দুরন্ত এই স্থান দেখতে গেলে একটু সাবধানতা অবলম্বন করবেন। কারণগুলো আগেই জানিয়ে দিয়েছি। ভারতের মন্দির স্থাপত্যের ইতিহাস নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেন তাঁদের অনেকেই তেলকুপী সম্পর্কে জানলেও দুর্গমতার কারণে আসতে পারেন না। প্রাচীন নাম তৈলকম্পী।

স্থানীয় এলাকায় শিখর রাজবংশের আমলে এই মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়। এই বংশের রাজা রুদ্রশিখরের নেতৃত্বে স্থানীয় জমিদাররা একজোট হয়ে পালবংশের রাজা রাম পালকে তাঁর রাজ্য বরেন্দ্রভূমি পুনরুদ্ধারে সাহায্য করেন। তেলকুপী পরবর্তী সময়ে একাধিক ব্রিটিশ স্থাপত্যবিদ ও পুরাতাত্ত্বিকরা বারবার পর্যবেক্ষণ করে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্ট লিখেছেন। এর অন্যতম ১৮৭৮সালে প্রকাশিত জে. ডি বেগলারের লেখা Report of A Tour through the Bengal Provinces (Vol VIII) বই। তিনিই সর্বপ্রথম তেলকুপীর মন্দির সম্পর্কে বিশদ বিবরণ লিখেছিলেন। তাঁর বর্ণনায় একাধিক মন্দিরের অস্তিত্ব রয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এর বেশিরভাগই আর নেই। কেবলমাত্র তেলকুপী মন্দিরটি ধংসের মুখে।

১৯০৩ সালে বেঙ্গল আর্কিওলজিকাল সার্ভেয়ার টি. ব্লচ তেলকুপী পরিদর্শন করে আরও বিস্তারিত রিপোর্ট দিয়েছিলেন। ১৯২৯ সালে পুরাতত্ত্ববিদ নির্মল কুমার বসু ও ১৯৫৯ সালে দেবলা মিত্র এই মন্দির পরিদর্শন করেন। তাঁরাও গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্র তৈরি করেন। তারপর কেউ কেউ এলেও, আর কোনওভাবেই এই মন্দির এলাকা পর্যটকদের আকর্ষণ করেনি। দুর্গম রাস্তার কারণেই এমন বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছে অতীতে বঙ্গভূমির অন্যতম প্রধান এক প্রবেশদ্বার তেলকুপী। সময় পেরিয়েছে, জলা-জঙ্গলে ঘিরে থাকা তেলকুপী ক্রমে আরও দুর্গম হয়েছে। কে বলবে এটা একুশ শতাব্দী !

এটা ইন্টারনেট যুগ। তেলকুপীর আসে পাশে গেলেই বোঝা যায় নির্জনতা কীরকম। অসাবধান হলেই বিপদ আপনার পায়ে পায়ে তেড়ে আসবে। নিছক অরণ্য রহস্যের রোমাঞ্চ যারা নিতে চান তারা না এলেই ভালো। আর যারা পুরাতত্ত্বের সাথে রোমাঞ্চকর ইতিহাসের সন্ধান পেতে চান তারা আসলে সাবধানতা অবলম্বন করবেন। পাথুরে মাটি, কাঁকর বিছিয়ে থাকা রাস্তা, ঘন বন, জলাভূমিতে মিশে থাকা বাংলা-ঝাড়খণ্ডের প্রান্তসীমায় এই প্রাচীন মন্দির স্থাপত্যের এলাকা শুধু বিস্ময় জাগায় না, তৈরি করে শিরশিরানি অনুভূতি।

মন্দিরটাই পুরো পাঞ্চেৎ জলাভূমির একটি চরের উপরে। তার চারপাশ দিয়ে ছড়িয়ে দিগন্ত ছুঁয়ে থাকা জলরাশি জীব বৈচিত্রের সম্ভার। প্রকৃতি বিশেষজ্ঞদের জন্য বিশেষ পছন্দে স্থান হতে পারে। ফেরার পথে মনে হচ্ছিল, কিছু ব্রিটিশ স্থাপত্যবিদ ও গুটিকয় ভারতীয় ইতিহাস গবেষকদের দেওয়া তথ্য না থাকলে তো মুছে যেতে চলা এক অপরূপ নিদর্শন চিরকালের মতো হারিয়ে যাবে কালের গভীরে। জলাভূমিতে লুকিয়ে থাকা তেলকুপী হারিয়ে যাচ্ছে। কেউ জানতেও চায় না। প্রশাসনের বয়েই গেছে…!