সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা: দুটো বছর পেরিয়ে গিয়েছে। তবু সেই দিনটা এখনও তাড়া করে বেড়ায় প্রিয়া বাগের পরিবারকে। প্রথমবার ভোট দেবার কথা মেয়ের, কিন্তু আদৌ কি ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে নিজের গণতান্ত্রিক মতবাদ প্রকাশ করবে সে ? প্রিয়া বাড়িতে ছিলেন না। উত্তর দিতে চাইলেন না মা’ও। শুধুই বললেন , “আমরা যেমন আছি ভালো আছি। মেয়েও ভালো আছে। আমরা আর এই বিষয়ে থাকতে চাই না।”

প্রিয়ার মা মহুয়া বাগ বললেন , “মামার বাড়ি গেছে মেয়ে।” কিন্তু কথা শুনে মনে হল মেয়েকে আড়াল করার চেষ্টা করল পরিবার। এই বিষয় নিয়ে কথা বলা পছন্দ হয় না। জানতে চাওয়া হয়েছিল প্রিয়ার ভোট দেওয়ার বিষয়ে। কিন্তু বারংবারই প্রিয়ার পরিবার আটকে থাকল দুই বছর আগের ঘটনায়।

৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, হাওড়ার উলুবেড়িয়ার তেহট্ট হাইস্কুলে সরস্বতী পুজোর বদলে নবি দিবস পালন করাকে কেন্দ্র করে তুমুল অশান্তির সৃষ্টি হয়েছিল। পুলিশের লাঠির ঘায়ে স্কুলের একাদশ শ্রেণীর ছাত্রী প্রিয়া বাগের মাথা ফেটে যাওয়ার পরে ঘটনা সাম্প্রদায়িক মোড় নেয়। তারপর কেটেছে দুটো বছর। শান্ত কাঁটাবেরিয়া গ্রামের স্কুলটিতে এখন কোনও সমস্যা নেই। গত বছরে এবং এই বছরেও সাধারণভাবেই হয়েছে সরস্বতী পুজো। কিন্তু কাঁচা পাকা বাড়িতে প্রিয়ার রোজগার জীবনটা তারপর থেকেই বদলে গিয়েছে। গ্রামের স্কুলে সেই কুখ্যাত ঘটনার জেরে পরিচিত হয়ে গিয়েছে প্রিয়া।

ভুঁইয়া পাড়ার খাল পাড়ের বাড়ি থেকে অন্তত দেড় দুই কিলোমিটার দূরের স্কুল। তার আগে থেকেই এক ডাকে সবাই চেনে প্রিয়াকে। জিজ্ঞাসা করলেই গ্রামের মানুষের মুখে একটাই কথা , “ওই যে মেয়েটার মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিল পুলিশ, তাই তো!”

স্কুল পাশ করে এখন কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে পড়াশোনা করছে প্রিয়া। কিন্তু স্কুলের প্রত্যেক স্যার থেকে কেরানি নাম বললেই বলে দেয় ওর বৃত্তান্ত। আর রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যাওয়াটাই একদম পছন্দ নয় প্রিয়ার পরিবারের। ভালো কাজের জন্য নয় , খারাপ ঘটনার জন্য মেয়ের নাম লোকের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ায়।

প্রিয়ার মা মহুয়া বাগ বলেন , “ও প্রথমবার ভোট দেবে কি দেবে না সেটা ওর ব্যপার। ভোটার খাতায় নাম আছে। ভোট দেওয়ারই তো কথা কিন্তু আমরা আর এই ব্যাপারে থাকতে চাই না। পড়াশোনা করছে। বড় হয়ে গেছে , এবার বিয়ের কথা ভাবতে হবে। আমাদের গরীব ঘরে এখন এটাই চিন্তা।” দাওয়ায় বসে ছিলেন ঠাকুমা মালতি বাগ। বৌমার কথা শুনে বললেন , “দেখুন আমরা গরীব মানুষ। মেয়ে পড়াশোনা করছে। যত দূর পারব পড়াবো , কিন্তু ওর বিয়ে কিভাবে হবে সেটা নিয়েই আমরা এখন বেশি চিন্তা ভাবনা করছি। দুই বছর আগের স্কুলের ওই ঘটনা ওর ভবিষ্যতের ক্ষতি করতে পারে তাই ভোট দেওয়ার চেয়ে ওর বিয়ের চিন্তা মাথায় বেশি ঘোরে।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রতিবেশী বললেন , “সেদিন যা হয়েছিল প্রিয়া কেমন ছিল তা মনে নেই। আমরা তো ভয়ে সবাই দৌড়চ্ছিলাম। এখন ও আমতা রামসদয় কলেজে পড়ে। বাবা মাছ ধরে ,বিক্রি করে সংসার চালায়। এইসবের জন্যই মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে ওর মা বাবা ভয় পায়। মেয়েকে অপরিচিত কারও সঙ্গে কথা বলতে দিতে চায় না।”