কলকাতা: মারাদোনা কত লম্বা? চার্লি চ্যাপলিন, সচিন তেন্ডুলকর, নেপোলিয়ন এঁদেরই বা উচ্চতা কত ছিল? নাহ এ জানতে আপনাকে এখন কুইজের বই ঘাঁটতে হবে না৷ স্রেফ চোখ কান খোলা রাখলেই হল৷ কেননা ঘুঘুর পরে ফাঁদ দেখানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে টিজারে পুজো অভিযান শুরু করেছিল যে ‘সন্তোষপুর লেকপল্লী’, তাদেরই শহরজোড়া দ্বিতীয় টিজারে মিলবে এসব তথ্য৷ কেন পুজোর প্রচারে এঁরা উঠে এলেন? তার পিছনে আছে এবারের পুজোবাজারের সত্যি আর পালটা সত্যির ইতিহাস৷

 এ শহরের পুজোর ইতিহাস প্রায় ৪০৫ বছরের পুরনো৷ শহরের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গিয়েছে পুজোর চেহারা৷PUJO-TEASER-04 এবারের পুজোর টিজার যুদ্ধ সেই বিবর্তনের ইতিহাসে নয়া সংযোজন হয়ে উঠতে পারে৷ বেশ কয়েক বছর হল পুজো উদ্যোক্তাদের মধ্যে এসেছে কর্পোরেট সংস্কৃতি৷ পুজোর প্রচার তাই একেবারে প্রথম থেকেই হয় নজরকাড়া৷ টিজার থেকে টিজার ব্রেক, প্রতিমা, মন্ডপে, পুজোর আবহ তৈরি, সামাজিক কার্যাবলী নানাবিভাগে একে অপরকে টেক্কা দিতে পুজো উদ্যোক্তা রীতিমতো প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবহে৷ এবং সেখানে শুধু উদ্ভাবনীতে একে অপরকে কুপোকাত করাই নয়, এবার জায়গা করে নিয়েছে কর্পোরেট জাগলারিও৷ ক’দিন আগেও বড় সত্যির কৌতূহল শহরবাসীকে মজিয়ে রেখেছিল৷  সে সত্যি রীতিমতো হাইজ্যাক হয়ে চলে গিয়েচিল আর এক উদ্যোক্তার দখলে৷ পরে সত্যির ভাঁড়ারে হানাদারি পরিষ্কার হয়ে গেলেও, সত্যি কিন্তু এবার পুজোর টিজারকে ছেড়েও ছাড়ছে না৷ ইতিমধ্যেই অগ্রদূত উদয় সংঘ ও চক্রবেড়িয়া সার্বজনীনের পুজো পোস্টারে উঠে এসেছে ‘সত্যি’র জের৷ একজন বাজারে ছেড়েছেন ‘প্রতিষ্ঠিত সত্যি’র তত্ত্ব, আর একজন তোপ দেগেছেন তথাকথিত  ‘পুজোর মুখ’-এর বিরুদ্ধে৷ ‘সত্যি’ টিজারের জোর যে জোরদার, তা বোঝা গেল সন্তোষপুর লেকপল্লির দ্বিতীয় টিজারে৷ PUJO-TEASER-03ঘুঘু দেখার পর ফাঁদ দেখানোর টিজার ছেড়ে, ‘বড় সত্যি’কে প্রায় নস্যাৎ করে দিয়ে তাঁদের পুজোটিজারে লেখা ‘পরমাণু বড় হয় না’৷ নাম না করলেও ইঙ্গিতটি যে কোনদিক তা স্পষ্ট৷ এবং সেইসঙ্গে বড় মানুষদের উচ্চতা যোগ করে দেওয়াটাই মাস্টারস্ট্রোক৷ কেননা কোন উদ্যোক্তা সবথেকে বড় দুর্গা প্রতিমা শহরে আনছেন তা যখন সবাই জানেন, তখন বড়টাকেই সন্দেহের কাঁটায় তুলে দিল এই টিজার৷

পুজোর এই টিজার যুদ্ধে আমোদ পাচ্ছেন শহরবাসীও৷  বাসে-ট্রামে ইতিউতি গল্প এ নিয়ে৷ ‘লালেই বিপদ’ এহেন টিজার দেখে সাধারণ মানুষ যেমন মুখ টিপে হাসছেন, তেমনই কিছু টিজার দেখে রীতিমতো চমকে যাচ্ছেন৷ যেমন সম্প্রতি এক টিজারে জানানো হচ্ছে, ‘এক ঝলক দেখেই আর থাকতে পারলাম না,নিজেকে সামলাতে পারবেন তো?’ তবে সবটাই যুদ্ধং দেহি নয়৷ কোনও কোনও পুজো উদ্যোক্তা নিজেদেরকেPUJO-TEASER-02 এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরিয়ে রেখেছেন৷ ত্রিধারা যেমন তাদের বিজ্ঞাপনি প্রচারে লিখেছে, ‘হৃদয়জুড়ে থাকতে চাই, সবার সেরা আমরা তাই৷’  আবার কোনও পুজোসংস্থা বেশ চমকে দিয়ে লিখেছেন, রাইমা ওর মাকে মাম্মা বলে, নুসরৎ ওর মাকে আম্মা বলে, আমি আমার মাকে ‘মা’ বলি-এর মতো টিজারও৷

ক্ষুরধার বিজ্ঞাপনী মস্তিষ্ক যে পুজোর টিজারগুলোর নেপথ্যে ক্রিয়াশীল, সে কথা অনেক উদ্যোক্তাই মেনে নিচ্ছেন৷ রীতিমতো এজেন্সি রেখেই যে পুজোর প্রচার চলছে, এবং সবরকম অঙ্ক কষেই যে এরকম বিজ্ঞাপন তৈরি হচ্ছে তা বিজ্ঞাপনগুলোর দিকে তাকালেই স্পষ্ট৷ বদলে যাওয়া সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নানা কিছু সংযোজন হয়েছে৷ পুজোর চালচিত্রের ইতিহাসে নতুন সংযোজন হয়ত এই পুজোর বিজ্ঞাপনি যুদ্ধ, টিজার নিয়ে কর্পোরেট জাগলারিই৷ সত্যিই তো, পুজোকে উপলক্ষ করে যে টিজারগুলোয় সেজে উঠল শহর, সেদিকে তাকিয়ে কৌতূহলী না হয়ে আর কী উপায় বাঙালির!

ছবি-মিতুল দাস