দেরাদুন: “সভ্যতার অভিধানে খামতি শুধু এই, মায়ের কান্নার কোনও প্রতিশব্দ নেই।” লাইন দুটো সমতলের এক কবি শ্রীজাতের লেখা। কিন্তু এই লেখার বোধ ছুঁয়ে যায় পৃথিবীর প্রতিটি কোন। সমস্ত পাহাড় হোক বা সমতল মায়ের মমতা সর্বত্র সমান। ভূপৃষ্ঠের সর্ব উচ্চতায় সর্বখানে সবকিছুর উর্দ্ধে ‘মা’৷ শত অভিমান-অভিযোগ-অনুযোগ থাক, কিন্তু সন্তানদের বেদনায় সমস্ত ক্রোধই যেন নিমেষেই উধাও হয়ে যায় মায়ের। সমস্ত অভিমান ভুলে একজন মা ছুটে যান তাঁর সন্তানের কাছে।

সম্প্রতি উত্তরের এক রাজ্যেও মিলেছে এমনই এক উদাহরণ। নিজের সন্তান একা পড়ে রয়েছে দেরাদুনে। এদিকে, স্কুলের ছোট্ট ছোট্ট সন্তানদের মুখ চেয়ে পাহাড় ডিঙিয়ে জল আনতে ছুটলেন উত্তরাখণ্ডের নওগাওয়ের একটি সরকারি স্কুলের শিক্ষিকা উত্তরা পান্ত বহুগুনা। মুহূর্তেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায় এই ভিডিও। শনিবার সোশ্যাল সাইটে ছেয়ে গিয়েছে এই ভিডিও।

তবে পিকচার অভি খতম নেহি হুয়ি। গতকালের এই ভিডিওর পিছনে রয়েছে আরও এক ইতিহাস। মনে আছে? গত বছর জনতার দরবার চলাকালীন উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বচসায় জড়িয়ে সংবাদের শিরোনামে এসেছিলেন এক শিক্ষিকা! হ্যাঁ সেই শিক্ষিকাই হলেন নওগাওয়ের সরকারি স্কুলের শিক্ষিকা উত্তরা পান্ত বহুগুনা। দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ের এই স্কুলে বদলি হয়ে শিক্ষকতা করে চলেছিলেন তিনি। পাহাড়ি এলাকায় সেই সূত্রে থাকতে হয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে। কিন্তু তা করতে গিয়ে নিজের ছেলেকে ছেড়ে থাকতে হয়েছে তাঁকে।

দীর্ঘ সময় দেরাদুনে একা কাটাচ্ছিলেন শিক্ষিকার ছেলে। এই বিষয় জানিয়েই জনতার দরবারে মুখ্যমন্ত্রীর সামনে মুখ খোলেন তিনি। জানান এবার সমতলে তাঁকে বদলি করা হোক। কিন্তু তার আর্জি মঞ্জুর হয়নি। উপরন্তু সাসপেন্ড হতে হয় তাঁকে। নিজের সহকর্মীদের বিদ্রুপের মুখেও পড়তে হয়েছিল বহুবার। চলতি বছরের মার্চেই ফের কাজে যোগ দিয়েছেন তিনি। পাহাড়ি এলাকার যে স্কুলে তাকে বদলি করা হয়েছিল সেই স্কুলেই ফের কাজে যোগ দিয়েছেন তিনি। সাস্পেনশন চলাকালীন বেতন পাননি বলেও অভিযোগ করেছেন শিক্ষিকা।

তিনি জানান, “আমার সমস্যাগুলোর কোন সমাধান হয়নি। আমার বক্তব্য খুব সাধারণ। জেলার রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত শিক্ষকরা সমতল এলাকায় বদলি হয়েছেন। কিন্তু আমাকে পাহাড়ি এলাকায় থাকতে হয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে। আমাকে এখন আমার ছেলের সঙ্গে থাকতে হবে। সে দীর্ঘ সময় দেরাদুনে একা কাটাচ্ছে। কিন্তু আমার অনুরোধ বিবেচনা করে দেখা হয়নি।”

কিন্তু এসব অভিযোগ শিকেয় তুলে যখন দেখেন স্কুলের ছোট ছোট বাচ্চাদের পানীয় জল নেই। তখনই আবেগে চোখ ভারী হয়ে আসে তাঁর। পাহাড়ি পথ পেরিয়ে ছুটে যান তাঁর ছোট্ট ছোট্ট সন্তানদের কষ্ট লাঘব করতে। মাথায় কলসী ভরে জল বয়ে আনেন ছাত্র-ছাত্রীদের পানীয় জল থেকে স্কুলে রান্নার জন্য জল মজুত করতে।

বহুগুনার কথায়, তাঁর স্কুলে জল নিয়ে যাওয়ার মত কেউ নেই। তাই তাঁকেই এই কাজ করতে হয়েছে। তাঁর স্কুলের বাচ্চাদের জন্য রান্না হয়। কিন্তু তার জন্য যে জলের প্রয়োজন তা মজুত ছিল না। তাই বাধ্য হয়েই স্কুলের নিকটবর্তী ঝিল থেকে রান্নার জল আনতে হয়েছে তাঁকে।

বহুগুনার স্কুলে রয়েছেন ১১জন পড়ুয়া। বহুগুনা আরও জানান, “আমাদের ভোজন মাতা(রান্নার লোক) অসুস্থ। তার অ্যাক্সিডেনট হয়েছে। তাই আমাকেই আমাদের স্কুলের বাচ্চাদের জন্য পানীয় এবং রান্নার জল আনতে হল।”