ওয়াশিংটন: করোনা ভাইরাসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু তার মধ্যে কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডের হত্যায় পথে নেমেছে মানুষ। করোনা ভাইরাসের ভয়কে তোয়াক্কা না করেই হোয়াইট হাউসের সামনে চলছে হাজার হাজার মানুষের প্রতিবাদ। এই প্রসঙ্গে এবার ফেসবুকে নিজের মতামত প্রকাশ করলেন লেখিকা তসলিমা নাসরিন।

তসলিমা লিখছেন, “ভাইরাসে মরতে হয় মরবে কিন্তু জর্জ ফ্লয়েডের হত্যার প্রতিবাদ করতেই হবে, অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে গর্জে উঠতেই হবে। জর্জ ফ্লয়েড লোকটি কালো, কোনও একটি দোকানে কিছু কিনতে গিয়ে ২০ টাকার জাল নোট দিয়েছিল বলে দোকানিরা পুলিশ কল করে, পুলিশ এসে হাতকড়া পরিয়ে জর্জকে নিয়ে যায়। এটুকু পর্যন্ত ঠিক ছিল। কিন্তু পুলিশের এক লোক হঠাৎ হাতকড়া পরা জর্জকে মাটিতে শুইয়ে তার গলা পিষতে থাকে হাঁটু দিয়ে। পুলিশের অন্য লোকগুলো দেখে গেছে শুধু, জর্জকে বাঁচাবার চেষ্টা করেনি। ভিডিওতে হত্যার নির্মম দৃশ্যটি দেখার পরও পুলিশগুলোকে গ্রেফতার করা হয়নি। প্রতিবাদ হচ্ছে দেখে মামলা করা হয়েছে, কিন্তু ফার্স্ট ডিগ্রি নয়, থার্ড ডিগ্রি মার্ডারের জন্য । থার্ড ডিগ্রি, এর মানে হত্যা করার উদ্দেশে পুলিশের লোকটি জর্জের ঘাড়ের ওপর বসে থাকেনি!!”

জর্জ ফ্লয়েডকে হত্যার দৃশ্যটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল। সেই মর্মান্তিক দৃশ্য দেখলে শিউরে উঠতে হয়। কৃষ্ণাঙ্গ সেই ব্যক্তির ঘাড়ে হাঁটু দিয়ে চাপ দিচ্ছে মার্কিন পুলিশ। সেই যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে জর্জ বলছেন, আমি শ্বাস নিতে পারছি না। এই মর্মান্তিক ঘটনার বিরুদ্ধে চলছে প্রতিবাদ।সরকারের প্রতিবাদে সরকারি জিনিসের ভাঙচুর হচ্ছে।

যদিও এই প্রসঙ্গে তসলিমা লিখছেন, “জর্জ ফ্লয়েডকে যেভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে পুলিশ, তার বিরুদ্ধে সব ধর্মের, সব বর্ণের, সব শ্রেণীর মানুষ আজ রুখে উঠেছে। বর্ণবৈষম্যের প্রতিবাদে গর্জে উঠেছে আজ আমেরিকা। তবে যারা বেরিয়েছে ঘর থেকে, সবাই প্রতিবাদের উদ্দেশে বের হয়নি। কেউ কেউ বেরিয়েছে ভায়োলেন্স করতে, কেউ কেউ বেরিয়েছে দোকানপাট লুঠ করতে। যে কোনও আন্দোলনেই এমন কিছু অসৎ লোক থাকেই, যারা মিছিলে যায় না, যারা মূলত দোকানপাট লুঠ করতে যায়। এদিকে কিছু মিডিয়া শুধু ভাংচুর,আর জ্বালানো পোড়ানোর কথাই বলছে, ,লুঠের কথাই বলছে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ মিছিলগুলোর কথা বলছে না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকে শেষ অবধি অন্যায় বলে প্রমাণ করার জন্য ওরা মরিয়া হয়ে উঠেছে। কিন্তু বাম হও, ডান হও, সাদা হও, কালো হও, সবচেয়ে বড় কাজ এই মুহূর্তে নিরপেক্ষ থাকা।”

তবে ভাঙচুর ও লুঠের ঘটনা ছেড়ে প্রতিবাদকে জরুরি বলেও মনে করছেন লেখিকা। তাঁর মতে প্রতিবাদ না হলে অন্যায়গুলি খুবই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। তাঁর মতে আমেরিকায় আগের থেকে বর্ণবাদ কমেছে। তিনি লিখছেন, “এই যে প্রতিবাদ হচ্ছে আমেরিকায়, জ্বালানো পোড়ানো আর লুঠের ঘটনা বাদ দিলে এ প্রতিবাদ অত্যন্ত জরুরি প্রতিবাদ। মিছিলে বা শহরে শহরে পুলিশের সংগে সংঘর্ষে গত দুদিনের যে চিত্রটি দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি, তা হলো সাদাদের উপস্থিতি। শুধু কালো নয়, সাদারাও প্রতিবাদ করছে, তাদের হাতেও ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ লেখা প্ল্যাকার্ড, তারাও স্লোগান দিচ্ছে, পুলিশের সংগে সংঘর্ষে তারাও যাচ্ছে।”

তসলিমার মতে সংখ্যালঘুরা একা আন্দোলন করে ফল পান না। তাই ভারতের প্রসঙ্গে লিখছেন, “ভারতীয় উপমহাদেশে এরকম দৃশ্যই দেখতে চাই। হিন্দুর ওপর অত্যাচার হলে মুসলমান প্রতিবাদ করবে, মুসলমানের ওপর হলে হিন্দু করবে প্রতিবাদ। এই সহযোগিতা, এই সহমর্মিতাই পৃথিবীকে সুন্দর করবে।”

প্রশ্ন অনেক-এর বিশেষ পর্ব 'দশভূজা'য় মুখোমুখি ঝুলন গোস্বামী।