সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : তিনি নির্বাসিত। ওপার বাংলা হোক কিংবা এপার বাংলা কেউ তাঁকে জায়গা দেয়নি। নিজের দেশ তাঁকে ঘরছাড়া করেছে। তবু তিনি ফিরতে চান। নিজের দেশে না হোক অন্য কোনও দেশে যেখানে অন্তত বাংলার ছাপ আছে। খুব আশা এই মহানগর একদিন তাঁকে আপন করে নেবে। সেই আশাতেই তিনি বারবার সোশ্যাল মাধ্যমে নিজের মত প্রকাশ করেন। তিনি তসলিমা নাসরিন। আবারও সম্ভবত ফিরে আসার সেই আশাতেই মুখ খুললেন তিনি। তাঁর ইঙ্গিত সর্বধর্ম নয়, বেশি সংখ্যালঘু তোষণেই নির্বাচনে খারাপ অবস্থা হয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের৷

তসলিমার শুক্রবার রাতের ট্যুইট পুরোদস্তুর কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে সামনে রেখে। তসলিমার বক্তব্যে স্পষ্ট সংখ্যালঘু , সংখ্যাগুরু রাজনৈতিক মেরুকরণের কথা। তিনি মনে করছেন মেরুকরণের ধারা পশ্চিমবাংলায় চলছে। বরাবরই সোজাসুজি কথা বলেন বিখ্যাত লেখিকা। এবারও তার অন্যথা হয়নি। তিনি লিখেছেন, “আমরা এতদিনে জেনে গিয়েছি যে , শুধুমাত্র মুসলিমদের সন্তুষ্ট করে সবসময় নির্বাচনে জেতা যায় না। এই বিষয় এবং ধারনা যদি মুছে গিয়েই থাকে, তাহলে হয়তো আমাকে কলকাতা প্রবেশ করতে বাধা দেওয়া হতো না।”

এই লেখার অন্দরে তসলিমার প্রথম আক্রমণ যেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকেই। কারণ একের পর এক ইস্যুতে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত সংখ্যালঘু ভোট পাওয়ার প্রচেষ্টার অভিযোগ এনেছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি। সেদিক থেকে তসলিমা নিজে ইসলাম ধর্মাবলম্বী হলেও তিনি নিজেকে সব সময়েই সংখ্যালঘু – গুরু এই মেরুকরণের বাইরে রেখেছেন। মুক্ত কণ্ঠে তিনি বলতে চেয়েছেন মনের কথা।

মুসলিম সম্প্রদায়ের হয়েও সম সম্প্রদায়েরর হাতেই তার অত্যাচারিত হওয়ার কথা সব সময় তার লেখায় ফুটে উঠেছে। লেখায় বারবার স্পষ্ট হয়েছে নারীবাদের কথা। বারবার প্রশ্ন তুলেছেন তাঁর নিজের দেশের মহিলা প্রধানমন্ত্রীরা তাঁর কথায় যেমন বাধা দিয়েছে তেমনই তিনি বাধা প্রাপ্ত হয়েছেন এপার বাংলার প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহায্য পেতেও। মহিলা হয়েও মহিলার লড়াইয়ের কথা বলতে গিয়ে এই রাজ্যে এসেও তাঁকে বাধা পেতে হয়েছে। তাঁর প্রিয় শহর কলকাতাতেও তিনি থাকতে পারেননি।

২৩ মে যখন নির্বাচনের ফল বেরিয়েছে দেখা গিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের আসন সংখ্যা ২০১৪-র ৩৪ থেকে কমে ২২টিতে এসে ঠেকেছে। তসলিমা যেন তাঁর ওই পোস্টে বলতে চেয়েছেন যে, মুসলিমদের এতো সুযোগ সুবিধা দিয়েও মানুষের ভালোবাসা পাওয়া গেল না। ভোট পাওয়া গেল না। সবধর্মের মানুষকে সমান চোখে দেখা হয়নি বলেই তৃণমূলের এই ভরাডুবি হয়েছে বলে ইঙ্গিত তসলিমার।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রত্যেকটি নির্বাচনী সভায় গিয়ে সর্বধর্মের প্রতি তাঁর সহাবস্থানের কথা বলেছেন কিন্তু তসলিমা মনে করছেন আদৌ সেটা হয়নি। তাঁর দাবি, সর্বধর্ম এবং সেক্যুলার ভাবনা যদি বিরাজ করত এই রাজ্যে তাহলে তাঁকে তাঁর প্রিয় শহর কলকাতায় প্রবেশ করতে বাধা দেওয়া হতো না। লেখিকা যেন হতাশ এই ভেবেই যে, একজন মহিলা হয়েও একজন মহিলার কথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বুঝলেন না। লেখার অন্দরে আবারও অভিযোগ তিনি শুধু মুসলিমদের ভোটের চাহিদাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন।

প্রসঙ্গত এই ট্যুইটের পিছনে তসলিমার খোঁচা দিয়েছেন বামকেও। কারণ সেই সময় থেকেই তিনি কলকাতায় বারংবার বাধা পেয়েছেন। যা পরবর্তীকালে বজায় থেকেছে ঘাস ফুলের আমলেও। এবারের লোকসভা নির্বাচনে তাঁর টার্গেটের একজনের আসন সংখ্যা প্রচুর কমে গিয়েছে, অপর দল বামেদের আসন সংখ্যা শূন্য।

পিছনে ফিরে দেখলেই তসলিমার বক্তব্যের সঙ্গে মিল স্পষ্ট হয়ে যাবে। তসলিমা নাসরিনকে ঘিরে বিক্ষোভ সামাল দিতে সেনা তলব এবং পত্রপাঠ তসলিমা বিদায়— ২০০৭-এর ঘটনা। তখন রাজ্যে বামেরা। আরও পিছিয়ে ২০০৩ সালের ২৮ নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গে নিষিদ্ধ করা হয় তসলিমার লেখা বই ‘দ্বিখণ্ডিত।’ ২০০৮ খ্রিস্টাব্দের ১৯শে মার্চ তসলিমা ভারত ছাড়তে বাধ্য হন।

এরপর মমতা-জমানায় কলকাতা বইমেলায় তসলিমার সেই বিখ্যাত ‘নির্বাসন’-বই প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় আসার ঠিক এক বছর পরেই ঘটেছিল সেই ঘটনা। ২০১২ সালের কলকাতা বইমেলায় ‘নির্বাসন’ প্রকাশ হওয়ার কথা থাকলেও পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ডের নির্দেশে তা বাতিল হয়ে যায়। তারপর থেকেই বারংবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বামেদের প্রতি নিজের ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন তসলিমা। এবারও তার অন্যথা হল না।