ফাইল ছবি

সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়: ১৯২০ সালের ১৭ অক্টোবর তাসখন্দে গড়ে ওঠে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি। আজ ২০২০ সালের ১৭ অক্টোবর, মাঝে কেটে গিয়েছে ১০০ বছর‌। এখনও ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির জন্ম নিয়ে বিতর্ক কাটেনি। একাংশের মতে, ১৯২৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর কানপুরে এক সম্মেলনের মাধ্যমে ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি আত্মপ্রকাশ করেছিল বলেও ধরা হয়।

যুগান্তর দলের সদস্য এবং বাঘাযতীনের ঘনিষ্ঠ অনুগামী নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য ( যিনি মানবেন্দ্রনাথ রায় নামে বেশি পরিচিত) ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের পথিকৃৎ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯১৫ সালে জার্মান অস্ত্রের আশায় বাঘাযতীনের নির্দেশে বাটাভিয়া গিয়েছিলেন।

সেখান থেকে তিনি আমেরিকা হয়ে মেক্সিকো যান। সেখানেই তিনি মার্কসবাদে দীক্ষিত হন। বলা হয়ে থাকে তিনি যখন মেক্সিকোতে প্রবেশ করেন তখন তিনি পুরোদস্তুর জাতীয়তাবাদী এবং সেখানে কিছুদিন কাটিয়ে মেক্সিকো ত্যাগ করার সময় হয়ে উঠেছিলেন এক দৃঢ়চেতা কমিউনিস্ট।

এরপর মানবেন্দ্রনাথ রায় ১৯২০সালে‌ লেনিনের আমন্ত্রণে রাশিয়া যান। রাশিয়ায় তাসখন্দে ২৪ জন বিপ্লবীকে সঙ্গে নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করেন। এদের মধ্যে ৭ জনকে রাখা হয়েছিল দলীয় কর্মসমিতিতে। সেদিন ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার সময় কর্মসমিতিতে যারা ছিলেন তারা হলেন, মানবেন্দ্রনাথ রায়,এভেলিনা ট্রেন্ট রায়, অবনী মুখোপাধ্যায়, রোজা ফিটিং গোপ, মহম্মদ আলী, মহম্মদ শফিকসিদ্দিকী, এম বায়াঙ্কার আচার্য।

মহম্মদ সিদ্দিকী দলের সম্পাদক নিযুক্ত হলেও মানবেন্দ্রনাথ রায় ছিলেন দলের প্রধান। পরের বছরেই এই দল কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল বা কমিন্টার্ন এর স্বীকৃতি লাভ করেছিল। তখন থেকে শুরু হয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম। ১৯২১ সালে কংগ্রেসের আহমেদাবাদ অধিবেশনে তাদের পক্ষ থেকে প্রথম তোলা হয় পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি।

এদিকে ১৯২২ সালের শেষ দিকে ভারতের মুম্বই, লাহোর, কলকাতা, মাদ্রাজ বিভিন্ন স্থানে কমিউনিস্ট গোষ্ঠী গড়ে ওঠে। ব্রিটিশরাজ এদেশে সাম্যবাদ রোধ করার জন্য ১৯২২ সালে ব্রিটিশ সরকার বিভিন্ন কমিউনিস্ট নেতাকে গ্রেফতার করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা শুরু করে। এইসব মামলায় মুজাফফর আহমেদ শ্রীপদ অমৃত ডাঙ্গে শওকত ওসমান নলিনী গুপ্ত প্রমুখের জেল হয়।

তখন আপাতত কমিউনিস্ট আন্দোলন স্তিমিত হলেও স্তব্ধ হয়নি। কিছুদিন বাদে ১৯২৫ সালে কমিউনিস্টরা যাতে ঐক্যবদ্ধ ভাবে কাজ করতে পারে সেই উদ্দেশ্যে ১৯২৫সালের ২৬ ডিসেম্বর কানপুরে সম্মেলনের আয়োজন হয়। প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতা সিঙ্গারাভেলু চেট্টিয়ার‌ সম্মেলনের সভাপতি হন।

বোম্বাইয়ের শ্রমিক নেতা এসবি ঘাটে হন দলের প্রথম সাধারণ সম্পাদক। ‌ এই সম্মেলনের মাধ্যমে ভারতের অভ্যন্তরে জন্ম নেয় ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি। সে দিক দিয়ে দেখতে গেলে আক্ষরিক অর্থে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি দ্বিজ। এর জন্ম দুবার – একবার তাসখন্দে অন্যবার কানপুরে।

সিঙ্গারাভেলু চেট্টিয়ার‌ ঘোষণা করেন, ভারতীয় কমিউনিজম বলশেভিজম নয়। ডাঙ্গেও ঘোষণা করেন, তিনি কমিউনিস্ট কিন্তু বলশেভিক নন। তবে তাদের এহেন মন্তব্যের বিরোধিতা করেন মানবেন্দ্রনাথ রায়। কারণ বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলনের কোন সম্পর্ক নেই তা তিনি ভাবতেই পারতেন না।

ব্রিটিশ আমলে নানা আন্দোলনের মধ্যে থেকেছে কমিউনিস্ট পার্টি। তখন থেকেই শ্রমিক আন্দোলনে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে হয়েছে কমিউনিস্টদের। দেশ স্বাধীন হলেও দেখা গিয়েছে কমিউনিস্ট পার্টিকে সাংবিধানিক কাঠামো এবং নাগরিক অধিকার রক্ষার জন্য আন্দোলন করতে।

আবার এদেশের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যেও নানা সময় নানা ইস্যুতে ভাঙ্গন ধরেছে। মতাদর্শ এবং কার্য পদ্ধতিগত মতভেদের জন্য ভাঙ্গন আর তার ফলে একদল ভেঙে আর এক দলের সৃষ্টি হয়েছে। কখনও কমিউনিস্টরা নিষিদ্ধ হয়ে চলে গিয়েছেন আন্ডারগ্রাউন্ডে। কখনও বা নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করেছেন কমিউনিস্টরা।

তবু এই ১০০ বছরের যাত্রাপথে বিভিন্ন সময়ে এদেশের কয়েকটি রাজ্যে ভোটে জিতে ক্ষমতায় আসতে সক্ষম হয়েছে কমিউনিস্টরা। বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছর টানা ক্ষমতায় থাকার রেকর্ডের অধিকারী কমিউনিস্টরা। কেন্দ্রে জোট সরকারের শরিক হয়েছে কমিউনিস্টরা।

লোকসভার অধ্যক্ষের পদ পেয়েছেন সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় ‌। সুযোগ এসেছিল জ্যোতি বসুর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার। কিন্তু সিপিএম দল তা অনুমোদন না করায় ভারতে এখনও কোনও কমিউনিস্ট নেতাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখা যায়নি। সময়ের সঙ্গে অবস্থান নীতি অনেক কিছু বদলে গিয়েছে কমিউনিস্টদের।

দীর্ঘদিন ধরে কংগ্রেসকেই শত্রু মনে করলেও এখন বামদলগুলির কাছে বিজেপি প্রধান শত্রু হয়ে উঠেছে। কংগ্রেস এবং কমিউনিস্টরা বরং এখন অনেক কাছাকাছি এসেছে । বর্তমানে কৃষি শিল্পের সংস্কার অনিশ্চিত করে দিচ্ছে শ্রমিক-কৃষক সাধারণ মানুষের ভবিষ্যৎ। আর তারফলে ভাঙ্গন ও বিবর্তনের মধ্য দিয়েই এগিয়ে চলে ভারতের কমিউনিস্টরা আজও প্রাসঙ্গিক থাকছে।

দেশে এবং বিদেশের একাধিক সংবাদমাধ্যমে টানা দু'দশক ধরে কাজ করেছেন । বাংলাদেশ থেকে মুখোমুখি নবনীতা চৌধুরী I