সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়: কবি দেশের কৃষকদের জন্য ভাবলেন পুরস্কার প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে বানালেন কৃষি ব্যাঙ্ক। কোন পুরস্কারের অর্থ দিয়ে। নোবেল পুরস্কারের অর্থ দিয়ে আর সেই নোবেলই আজ নেই। চুরি যাওয়ার পর সিবিআই সিআইডি তদন্তের ভার পালটেও লাভ হয়নি।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৯১ সালে সর্বপ্রথম পতিসরে আসেন।উদ্দেশ্য কাছারি বাড়ি এবং জমিদারি সামলানো। এই কাছারি বাড়ি এখন বাংলাদেশের অংশে পরে। জমিদারী দেখা শোনার জন্য এলেও প্রকৃতি ও মানব প্রেমী কবি তৎকালীন অবহেলিত পতিসর এলাকার মানুষের জন্য দাতব্য চিকিৎসালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা সহ অনেক জনহিতৈষী কাজ করেছিলেন। যার মধ্যে অন্যতম কৃষি ব্যাঙ্ক। এখানকার কৃষকদের কল্যানে নোবেল পুরস্কারের ১ লক্ষ ৮ হাজার টাকা দিয়ে তিনি কৃষি ব্যাঙ্ক স্থাপন করেন।পতিসারে এসে কৃষকদের খুব কাছাকাছি আসতে সক্ষম হয়েছিলেন। এতে কৃষকের অর্থনীতি সম্পর্ককে ভালো ধারনা জন্মেছিল। পতিসরের প্রতি রবীন্দ্রনাথের ছিল অগাধ ভালবাসা, ছিল এখানকার মানুষের প্রতিও।

রবীন্দ্রনাথ দরিদ্র প্রজাদের দুঃখ দুর্দশার কথা ভাবতেন। জমিদারি পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি কখনও প্রজাদের অত্যাচার করনি। উল্টে খাজনা মুকুব করেছিলেন তাঁর সমগ্র জমিদারীতে। পল্লীর উন্নয়নে জন্য এবং মহাজনদের হাত থেকে কৃষকদের মুক্ত করতে সমবায় পদ্ধতিতে ১৯০৫ সালে কালিগ্রাম পরগণার পতিসরে ওই কৃষি ব্যাঙ্ক স্থাপন করেছিলেন।

১৯১০ সালে উত্তরবঙ্গের বন্যার পর আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় মহাশয়ের বন্যাত্রাণ ফান্ডে কিছু টাকা উদ্বৃত্ত হয়েছিল এবং ওই টাকায় আমেরিকা হইতে কয়েকটি ট্রাক্টর ক্রয় করা হয়। রবীন্দ্রনাথ একটি ট্রাক্ট্রর লইয়া পতিসর অঞ্চলে কলের লাঙ্গল দিয়া জমি চাষ প্রবর্তন করেছিলেন। গ্রামবাসীকে ট্রাক্ট্ররের ব্যবহার শিখিয়েছিলেন পুত্র রথীন্দ্রনাথ। আমেরিকায় কৃষিবিদ্যা নিইয়ে পড়াশোনার সময় ট্রাক্টর চালানো শিখেছিলেন তিনি। ১৯৩৭ সালে রবীন্দ্রনাথ পতিসর ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় সব সম্পদ প্রজাদের মধ্যে দান করে দিয়েছিলেন।

ঠাকুর পরিবারের বাংলাদেশে ৩ টি জমিদারী ছিল। পতিসরে কবিগুরুর আসাও নিজ ইচ্ছায় নয়। এজমালি সম্পত্তির সবশেষ ভাগে বিরাহিমপুর ও কালিগ্রাম পরগনার মধ্যে সত্যেন্দ্রনাথের পুত্র সুরেন্দ্রনাথকে তাঁর পছন্দের অংশ বেছে নিতে বললে তিনি তখন বিরাহিমপুরকে পছন্দ করে তখন স্বভাবতই রবীন্দ্রনাথের অংশে এসে পরে কালিগ্রাম পরগনা যার সদর ছিল পতিসর।

আজও কাছারি বাড়ির ভেতরে ঢুকলেই দেখা মিলবে রবিঠাকুরের আবক্ষ মূর্তি। ঘরগুলি কবির ব্যবহার্য বিভিন্ন তৈজসপত্র, নানা রকম সামগ্রী, তাঁর হস্তলিপি আর বিভিন্ন ছবিতে ভরা। একটি বাথটাব, একটি নোঙর, বিশাল আয়না, আরাম কেদারা, ওয়্যারড্রব, ঘড়ি, গ্লোব, সিন্দুক, খাজনা আদায়ের টেবিল, খাট, আলমারি, দরজার পাল্লা, জানালা ইত্যাদি। পাশেই রয়েছে কবির ছেলের নামে প্রতিষ্ঠিত ‘রথীন্দ্রনাথ ইনস্টিটিউশন’।

কবির সাহিত্য সৃষ্টির একটি বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে এই পতিসর। পতিসরে বসেই কবি- চিত্রা, পূর্ণিমা, সন্ধ্যা, গোরা, ঘরে-বাইরেসহ অসংখ্য গ্রন্থ রচনা করেন। ১৯৩৭ সালের ২৭ জুলাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শেষবারের মত পতিসরে আসেন। রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি বুকে নিয়ে আজও দাড়িয়ে আছে পতিসর কুঠিবাড়ী। বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ১৯৯০ সালে এ কুঠি বাড়ীটির দায়িত্ব গ্রহণ করে।