সঞ্জয় কর্মকার, বর্ধমান: দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বর্ধমানের সীতাভোগ ও মিহিদানাকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দেবার স্বীকৃতি মিলল। কার্যত, এই স্বীকৃতির জোড়েই ঐতিহাসিক সীতাভোগ ও মিহিদানা বিশ্বের কাছে চিহ্নিত হ’ল ‘বর্ধমান সীতাভোগ’ এবং ‘বর্ধমান মিহিদানা’ নামে। পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে ১১ ও ১২তম মৌলিক মিষ্টির সুনামের অধিকারী হল বর্ধমানের ঐতিহ্যবাহী সীতাভোগ ও মিহিদানা।

এর আগে এ রাজ্যের দার্জিলিং-এর চা, নক্সী কাঁথা, শান্তিনিকেতনের চামড়ার সামগ্রী, লক্ষ্ণণভোগ আম, হিমসাগর (ক্ষীরসাপাতি আম), ফজলী আম, শান্তিপুরী শাড়ি, বালুচরী শাড়ি, ধনেখালি শাড়ি, জয়নগরের মোয়া জিওগ্রাফিক্যাল ইনডিকেশনের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হলেও সীতাভোগ, মিহিদানার জি আই পাওয়া নিয়ে গত প্রায় দুবছর ধরে নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছিল। অবশেষে এই সুখবর এসে পৌঁছালো বর্ধমানের মিষ্টান্ন ব্যবসায়ীদের কাছে।

আরও পড়ুন:এপারের ল্যাংচা আর ওপারের বালিশ

 

বর্ধমানের মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের সহকারী কোষাধ্যক্ষ সৌমেন দাস জানিয়েছেন, বর্ধমানের এই সীতাভোগ এবং মিহিদানাকে জি আই-এ অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ২০১৫ সালের ১৩ মার্চ বর্ধমান জেলা শিল্প কেন্দ্রের জেনারেল ম্যানেজার আবেদন করেন। একইসঙ্গে তাঁরাও সাংগঠনিকভাবে একটি আবেদন করেন। এরপর ওয়েষ্ট বেঙ্গল স্টেট কাউন্সিল অফ সায়েন্স অ্যাণ্ড টেকনোলজির এ্যাডমিনিষ্ট্রেটিভ অফিসার পর্ণ চন্দ ২০১৬ সালের ২৬ অগষ্ট চেন্নাইয়ের জিওগ্রাফিক্যাল ইনডিকেশনের রেজিষ্টারকে এব্যাপারে আবেদন জানান।এব্যাপারে পূর্ণ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন পেটেণ্ট বিজ্ঞানী মহুয়া হোমচৌধুরীও। অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর মিলল এই সুখবর।

আরও পড়ুন:মমতার হাতে এ বার ভাগ্য ফিরছে বাতাসা-নকুলদানার!

সৌমেনবাবু এদিন জানিয়েছেন, ১৯০৪ সালের ৯ আগষ্ট লর্ড কার্জন বর্ধমানে আসেন। সেইসময় বর্ধমানের মহারাজ বিজয়চাঁদ মহতাব বর্ধমানের বিশিষ্ট মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী ভৈরবচন্দ্র নাগকে বিশেষ ধরণের মিষ্টি প্রস্তুত করার নির্দেশ দেন। লর্ড কার্জনকে স্বাগত জানাতেই ভৈরবচন্দ্র নাগ তৈরি করেন সীতাভোগ এবং মিহিদানা। যা খেয়ে লর্ড কার্জন অভিভূত হয়ে যান। এমনকি এরপর ১৯৬৫ সালে দুর্গাপুরে কংগ্রেসের এক অধিবেশনে এসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী এবং পণ্ডিত জহরলাল নেহরু আসলে তাঁরাও সীতাভোগ-মিহিদানা খেয়ে ভূয়সী প্রশংসা করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ নভেম্বর রেডিওয় বর্ধমানের এই সীতাভোগ মিহিদানা নিয়ে প্রতিবেদন সম্প্রচারিত হয়।

মিহিদানা

সৌমেনবাবু জানিয়েছেন, শনিবার রাত্রে তাঁরা জানতে পেরেছেন জিওগ্রাফিক্যাল ইনডিকেশনে রাজ্যের মধ্যে ১২তম এবং গোটা দেশের ৫২৫ তম জিআই-এর স্বীকৃতি পেয়েছে সীতাভোগ এবং ৫২৬ তম জিআই-এর স্বীকৃতি পেয়েছে বর্ধমানের মিহিদানা। তিনি জানিয়েছেন, এই স্বীকৃতি পাওয়ায় সীতাভোগ এবং মিহিদানা নিয়ে যেমন অসাধু ব্যবসা রোধ হবে তেমনি বিশ্বের দরবারেও পৌঁছে যাবে বর্ধমানের এই মিষ্টি।

সীতাভোগ

আগামী ৭ এপ্রিল বর্ধমান জেলাকে ভাগ করতে আসানসোলে আসছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ওইদিনই তিনি বর্ধমান তথা প্রস্তাবিত পূর্ব বর্ধমানের তাঁর স্বপ্নের মিষ্টি হাবেরও উদ্বোধন করবেন। তার আগে বর্ধমানের এই সীতাভোগ মিহিদানার জি আই স্বীকৃতি মুখ্যমন্ত্রীর বিশ্ব বাংলা ব্র্যান্ডকে আরও গৌরবোজ্জ্বল করল বলে মনে করছেন মিষ্টান্ন ব্যবসায়ীরা। সৌমেনবাবু জানিয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রীর ঐকান্তিক ইচ্ছায় এই স্বীকৃতি লাভ হওয়ায় রবিবারই তাঁকে ট্যুইট করে শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে। ৭এপ্রিল সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীকে তাঁরা শুভেচ্ছাও জানাতে চলেছেন।

বর্ধমান জেলা ভাগের আনুষ্ঠানিক সূচনার আগেই প্রস্তাবিত পূর্ব বর্ধমান জেলার বাসিন্দাদের কাছে সুখবর নিয়ে এল জিওগ্রাফিক্যাল ইনডিকেশন দফতর। বর্ধমানের এই মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি প্রদীপ ভকত জানিয়েছেন, এই জিআই-এর স্বীকৃতি পাওয়ায় তাঁরা রেল দপ্তরের কাছে বর্ধমান ষ্টেশনে একটি জায়গার জন্য আবেদন করতে চলেছেন। সেখান থেকে জিআই রেজিস্টার্ড গুণমান সম্পন্ন সীতাভোগ ও মিহিদানা বিক্রির উদ্যোগ নিচ্ছেন তাঁরা। এছাড়াও তাঁরা ফ্লেক্স ও বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে তাঁরা তুলে ধরছেন এই জিআই স্বীকৃতির কথা। তিনি জানিয়েছেন, সমিতিগতভাবে তাঁরা ৪৩জন মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী এই জিআই-র জন্য লড়াই করেছেন। কোন্ কোন্ দোকানে জিআই স্বীকৃত এই সীতাভোগ মিহিদানা পাওয়া যাবে তারও উল্লেখ করবেন তাঁরা প্রচারের মাধ্যমে। যাতে ক্রেতা কোনোভাবে প্রতারিত না হন সে ব্যাপারে তাঁরা উদ্যোগ নিতে চলেছেন।

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ