সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : প্রেমের ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ। জাতি , ধর্ম বর্ণের উর্ধে ভাবতে শেখাতেন তিনি। তাঁর শিষ্য বিবেকানন্দও একই ভাবধারায় বিশ্বাসী ছিলেন। সেই কাজ করেই দক্ষিণেশ্বরে নিষিদ্ধ হয়েছিলেন তিনি। শ্রীশ্রী ঠাকুরের জন্মতিথি উৎসব পালনেই ঘটেছিল এমন ঘটনা।

কি এমন মত পোষণ করেছিলেন স্বামীজী? জানা যায় ১৮৯৬ সালে ঠাকুরের জন্মতিথিতে মহিলাদের যোগদানে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। মূলত ওই দিনে পতিতাদের দক্ষিণেশ্বরে প্রবেশে বাধা দিতেই ওই বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছিল। কোনও লাভ হয়নি। উলটে দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরের জন্মতিথি উৎসবে বেশি পতিতা মহিলার আগমন হয়। এই কথা অভিযোগ হিসাবে বিবেকানন্দকে জানাতে স্বামীজী পতিতাদের হয়ে কথা বলেছিলেন। এতেই বিবেকানন্দকে দক্ষিণেশ্বরে প্রবেশে নিষিদ্ধ করা হয়।

ঘটনা কেমন ? ১৮৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের তৃতীয় সপ্তাহ। পুরোনো কোলকাতার চিৎপুর রোডের উপর জোড়াসাঁকো পর্যন্ত লাল সালুতে লেখা বিজ্ঞপ্তি –” দক্ষিনেশ্বরের শ্রী রামকৃষ্ণ জন্মতিথি পালন মহোৎসবে স্ত্রীলোক মাত্রেরই যোগদান নিষিদ্ধ ।” শহরের অন্যান্য অঞ্চলেও একই নিষেধ ঘোষনা করে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। কেন এমন বিজ্ঞপ্তি? জানা যায়, ১৮৯৬ এর আগের বেশ কয়েক বছর উৎসব প্রাঙ্গণে পতিতাদের সমাগম দেখে বিভিন্ন মহলে কটুক্তি বর্ষণ হয়েছিল, তাই স্বামী ত্রিগুনাতীতানন্দ (সারদা মহারাজ ) কয়েকজন সেবককে নিয়ে এই বিজ্ঞপ্তির ব্যবস্থা করেন ।

এবার ১৮৯৬ সালে রামকৃষ্ণ জন্মতিথি পড়েছিল ১৫ ফেব্রুয়ারি,শনিবার। রীতি মেনে দক্ষিনেশ্বরের মন্দিরে জন্মতিথি পালন মহোৎসব হবে পরের রবিবার ২৩ ফেব্রুয়ারি । মহোৎসবের দিন সব বিজ্ঞপ্তি উপেক্ষা করে দলে দলে “নানা শ্রেণীর মহিলা” র সমাগম দেখে ত্রিগুনাতীতানন্দ স্বামী দক্ষিনেশ্বরের মন্দিরের প্রধান ফটক বন্ধ করার আদেশ দিলেন ।কিন্তু বিপুল জলধি তরঙ্গ রুধিবে কে? স্থলপথ বন্ধ -জলপথে স্টীমারে দলে দলে নানা শ্রেণীর মহিলারা এসে দক্ষিনেশ্বরের মন্দির প্রাঙ্গণে ঘুরে বেড়াতে লাগল । অবশেষে গিরিশ চন্দ্র ঘোষের অনুরোধে প্রধান ফটক খুলে দিতেই বাঁধভাঙা জলস্রোতের মত মহিলারা আসতে থাকলো ।প্রত্যক্ষদর্শী স্বামী অখন্ডানন্দ তাঁর ‘স্মৃতি কথা’ তে লিখেছেন -“অনেকেই বলিল, বাধা দেওয়ার ফলে এ বৎসর স্ত্রীলোকের সংখ্যা খুব বেশী হইয়াছে “!

আরও পড়ূন – লক্ষীর বদলে বোকাভাঁড়ে সরস্বতীর সামগ্রী জমিয়ে প্রান্তিক পড়ুয়াদের দান অগ্রজদের

এই বিপুল সংখ্যক “কলঙ্কিত চরিত্রের নারীদের উপস্থিতিতে বিব্রতদের মুখপত্র রামদয়াল চক্রবর্তী স্বামী বিবেকানন্দর কাছে অভিযোগ পেশ করলেন । সুদূর Lake Lucerene, সুইজারল্যান্ড থেকে ২৩ শে অগস্ট ১৮৯৬ শশী মহারাজ (স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ ) কে লেখা চিঠিতে স্বামীজি রামদয়ালের অভিযোগ এর উত্তর দিলেন – ‘বেশ্যারা যদি দক্ষিনেশ্বরের মহাতীর্থে যাইতে না পায় কোথায় যাইবে? পাপীদের জন্য প্রভুর বিশেষ প্রকাশ,পুণ্যবানের জন্য তত নহে ‘। আরও লিখেছিলেন, ‘যাহারা ঠাকুরঘরে গিয়াও ওই বেশ্যা, ঐ নীচ জাতী, ঐ গরিব, ঐ ছোটলোক ভাবে তাহাদের ( অর্থাৎ যাহাদের তোমরা ভদ্রলোক বলো )সংখ্যা যত কম হয় ততই মঙ্গল।’

এই মতের ফলেই স্বামীজির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। কেমন ছিল সেই ঘটনা? পরের বছর ১৮৯৭ সাল। স্বামী বিবেকানন্দ কয়েকজন গুরুভাই ও অনুরাগী সহ খালিপায়ে গেরুয়া আলখাল্লা ও পাগড়ি পরনে দক্ষিনেশ্বরের মহাতীর্থে পৌঁছলেন।স্বামী প্রভানন্দ ‘রামকৃষ্ণ মঠের আদিকথা’-তে লিখছেন ‘স্বামী বিবেকানন্দের দক্ষিনেশ্বর -প্রাঙ্গণে শ্রী রামকৃষ্ণ জন্মমহোৎসবে এই প্রথম ও শেষ যোগদান।তাঁর অনুসরণকারী দেশ বিদেশের বহু ভক্তের সমাগমে সেদিন দক্ষিনেশ্বর আন্তর্জাতিক মহাতীর্থের রূপ ধারণ করেছিল। এমন জমকালো শ্রী রামকৃষ্ণ জন্মমহোৎসব পূর্বে বা পরে কখনও হয়নি।’

২১ মার্চ ১৮৯৭ স্বামী বিবেকানন্দ খেত্রীর মহারাজা, সহ আরও কয়েকজন সাধু ভক্তের সঙ্গে দক্ষিনেশ্বর মন্দিরের সেবাইতকে জানিয়ে প্রবেশ করেন ও মন্দির ও সব স্মৃতিবিজরিত স্থান পরিভ্রমণ করেন। এর পরদিনই সেবাইত ত্রৈলোক্যনাথ বিশ্বাস পত্রিকার মারফত জনসাধারণকে জানান যে – ‘বিদেশ প্রত্যাগত স্বামী বিবেকানন্দর দক্ষিনেশ্বর মন্দিরে প্রবেশ অনভিপ্রেত ছিল ও এখন থেকে নিষিদ্ধ হল।’