মৌমিতা পোদ্দার, কলকাতা: অর্থ,যশ, প্রতিপত্তি যে কিছুই নয় প্রিয় অভিনেতার মৃত্যুতে ফের তার প্রমাণ মিলল।

শুধুমাত্র ভালোভাবে বেঁচে থাকা বা আমাদের সুখের জন্য টাকাই যে শেষ কথা নয়, না ফেরার দেশে গিয়ে সেই বার্তাই যেন আমাদের সকলকে দিয়ে গিয়েছেন সুশান্ত সিং রাজপুত।

সবেমাত্র কটা দিন হয়েছে তিনি আর আমাদের মধ্যে নেই। সকলের প্রিয় তারকা আজ আকাশের তারা। তবে তাঁর মৃত্যু নিয়ে ক্রমশ ঘণীভূত হচ্ছে রহস্যের মেঘ। বিটাউন থেকে রাজনৈতিক মহল প্রতিভাবান এই তারকার মৃত্যুতে শোকাহত সকলেই।

তবে সুশান্ত সিং রাজপুতের আত্মহত্যার পিছনে মানসিক অবসাদকেই প্রাথমিক ভাবে মূল কারন হিসেবে ভাবা হচ্ছে। যদিও ‘মানসিক অবসাদ’ কথাটি শুনতে যতটা ছোটো লাগে কিন্তু ঠিক ততটাই বড় এর পরিধি। কারন, মনের অসুখের চিকিৎসা সময়মতো না হলে তার পরিণাম যে কতটা খারাপ হতে পারে, মরে গিয়ে সেই কথা সবাইকে বুঝিয়ে দিয়েছেন সুশান্ত।

মানসিক অবসাদ বা মনের অসুখ। কথাটা শুনলেও হাত-পা যন্ত্রনার মতো বড় কোনও অসুখ নয় ভেবে ততটা আমল দিই না আমরা এই রোগের প্রতি। কিন্তু মনোবিদরা বলছেন অন্য কথা।

বিশিষ্ট মনোবিদ ডঃ প্রতীক পোদ্দারের কথায়, শরীরের অন্যান্য অসুখের মতোই জটিল একটি অসুখ হল মানসিক অবসাদ। মনের এই রোগ থেকে চিরতরে মুক্তি পাওয়ার ওষুধ বা ইঞ্জেকশন আজও অজানা ডাক্তারদের কাছে।

তবে মনের একটু যত্ন নিলেই সেরে ওঠা যায় এই রোগ থেকে। শুধু দরকার একজন খুব কাছের মানুষের। যে ধৈর্য ধরে শুনবে আপনার কথা। সমস্যা সমাধানের উপায়ও বাতলে দেবেন।

যদিও, যন্ত্র সভ্যতার এই যুগে এমন বন্ধু পাওয়া বেশ দুষ্কর। একথা একবাক্যে মানছেন আট থেকে আশি সকলেই।

যদিও হঠাৎ করেই কেউ মানসিক রোগে আক্রান্ত হন না। কোনও বিষয় নিয়ে দুঃশ্চিন্তা ধীরে ধীরে জন্ম দেয় মানসিক অবসাদের। বা জীবনে কোনও কিছুতে ব্যর্থ হলে আর সেই ব্যর্থতাকে হাসিমুখে মানতে না পারলেও জন্মায় মানসিক অবসাদ। আর যা ক্রমশ আমাদের স্নায়ু তন্ত্রের উপর কুপ্রভাব ফেলে। আর তখনই মনের ভিতর জন্ম নেয় সুইসাইড বা নিজেকে শেষ করে দেওয়ার মতো চরম ইচ্ছা। ঠিক যেমন সুশান্ত সাফল্যের শিখরে থাকার পরেও একের পর এক সিনেমা হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় গত একবছর ধরে ভুগছিলেন অবসাদে। তার উপর ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়েও ছিলেন টানাপোড়নে। শেষপর্যন্ত পৃথিবী থেকে নিজেকে সরিয়ে দেওয়ার মতো চরম একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন তিনি। তার পরের অংশটুকু আমাদের প্রত্যেকেরই জানা।

কিন্তু আপনিও কী মানসিক অবসাদগ্রস্ত? বুঝবেন কী করে? তাহলে জেনে নেওয়া যাক এই বিষয়ে মনোবিদরা কী বলছেন।

যেমন, আমি মানসিক রোগে ভুগছি বললেই কেউ মানসিক রোগী হয়ে যায় না। অন্যান্য রোগের মতো এই অসুখেরও কতগুলি লক্ষ্মণ রয়েছে।

যেমন ধরুন, আমার আজকের দিনটা খুব খারাপ কেটেছে মানে এই নয় যে, আমার প্রতিদিনই খারাপ যাবে। ঠিক তেমনই কোনও কিছু নিয়ে বেশী নেতিবাচক চিন্তাভাবনা একজন সুস্থ মানুষকে ধীরে-ধীরে মানসিক রোগী করে তোলে। আর এই রোগের প্রধান লক্ষণ গুলিই হল, কোনও কাজের প্রতি উৎসাহ উদ্দিপনা হারিয়ে ফেলা। কম কথা বলা, নিজেকে ক্রমশ,সকলের থেকে গুটিয়ে নেওয়া। এছাড়াও প্রিয়জনদের থেকে প্রতারিত, নিজের ব্যর্থতাও জীবনকে অনেক সময় অবসাদগ্রস্ত করে তোলে।

এছাড়াও মানসিক সমস্যায় ভুক্তভোগী রোগীদের দুধরনের লক্ষণ দেখা যায়, যেমন অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়লে অনেকেই আবার বেশি বেশি খাওয়া শুরু করেন, কম ঘুমান, অতিরিক্ত কথা বলা বা হঠাৎ করে রেগে যান এবং অপ্রাসঙ্গিক কাজকর্ম করতে শুরু করেন।

আবার অনেকেই ঠিক সুশান্তের মতো হয়ে যান। বাস্তব জগৎ থেকে নিজেকে ক্রমশ একঘরে করে ফেলেন। মুড সুইং ঘটে তবে। এছাড়াও মানসিক অবসাদ এমনই একটা রোগ, মনে জমানো দুঃখ কষ্টের কথা খুলে বলার লোক না পেলে নিজের জীবনকে শেষও করে দেওয়ার ইচ্ছা জাগে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কারও মধ্যে মানসিক অবসাদের লক্ষণ ফুটে উঠতে দেখলে তাঁর সঙ্গে অবশ্যই প্রাণ খুলে কথা বলুন। তাঁর মনের খবর নিন। এছাড়াও তিনি যে মানসিক অবসাদে ভুগছেন সেই বিষয়ে বাড়ির লোক বা তাঁর কাছের বন্ধুদের অবগত করুন। আর সেরকম মনে করলে দেরী না করে অবশ্যই কোনও মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়ায় শ্রেয়।

আবার কখনও কোনওরকম মানসিক অবসাদ ছাড়াই অনেকেই নিজের মৃত্যু কামনা করেন। হয়ত তাঁদের ভিতরেও কোনও চাপা কষ্ট আছে। যা,একান্ত আপন। তবে একটা সুইসাইডই জীবনের সব সমস্যার সমাধান কখনই হতে পারে না।

এই ধরনের চিন্তা মাথায় ঘুরলে অবশ্যই পরিবারের সঙ্গে কথা বলুন। কোনও বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে না পারলে তাঁরাই আপনাকে সাহায্য করবে। আর সেরকম মনে করলে অবশ্যই কোনও মনোবিদের পরামর্শ নিন, নিজের কাউন্সেলিং করান। দেখবেন একদিন সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। মনে রাখবেন সবসময় ইতিবাচক চিন্তাভাবনায় ভালো কিছু করতে সাহায্য করে।

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ