দেবময় ঘোষ, কলকাতা: সোমবার সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্সে সিবিআই দফতরের সামনে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্রের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্য বামফ্রন্টে মতবিরোধ তুঙ্গে৷ সিপিএম ছাড়া বামফ্রন্টের তিন বড় শরিক সিপিআই, ফরওয়ার্ড ব্লক এবং আরএসপি সূর্যকান্তের বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে৷ সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক কেন ‘Confusion’ তৈরি করছেন, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে৷ ২০১১ সালে রাজ্যের ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হয় সিপিএমের নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট৷ কিন্তু অন্য বাম শরিকদের সাফ কথা, ক্ষমতা গেলেও ‘দাদাগিরি’ করার স্বভাব যায়নি সিপিএমের৷ রাজ্য সম্পাদক বামফ্রন্টকে তোয়াক্কা করছেন না৷ এমনকী বামফ্রন্টের আহ্বায়ক বিমান বসুও খবর রাখছেন না যে, ‘সূর্য মিশ্র’ কখন কোথায় কী কথা বলে বেড়াচ্ছেন৷ নিজের অলক্ষেই বাম ঐক্যের ক্ষতি করছেন৷

সোমবার সল্টলেকে সূর্যকান্ত বলেছিলেন, ‘‘Maximised Polling Against BJP and TMC – একথা আমরা বলছি৷ বিজেপিকে হারাতে যেখানে সিপিএম থাকবে না সেখানে কংগ্রেসকে সমর্থন করতে হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না৷’’ সূর্যের মন্তব্যেই পরই তাঁকে স্বাগত জানান প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি সোমেন মিত্র৷ উৎসাহিত আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের ম্যানেজাররা ২০১৬ সালের তেতো অভিজ্ঞতার কথা ভুলে সমঝোতার গন্ধে পেট ভরাতে শুরু করেন৷ তবে সিপিএমের উদ্দেশ্যে প্রদেশ সভাপতির বক্তব্যে শুধুই ‘মাখন’ ছিল না৷ নিজের বক্তব্যের ঝাঁঝালো অংশটিতে সোমেন বলেছিলেন, ‘‘২০১৬ সালে একসঙ্গেই লড়েছিলাম৷ হাত ছেড়েছিলেন আপনারাই (সিপিএম)৷ এবার আশাকরি প্রতারিত হব না৷’’ তবে বাম শরিকরা বিষয়টিকে সিপিএম-কংগ্রেসের ‘গট-আপ গেম’ হিসেবেই দেখছে৷ স্বাভাবিক ভাবেই আলিমুদ্দিনের মাতব্বরিতে লোকসভা ভোটমুখী বাংলায় আরও একবার শরিকি দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে এসে গিয়েছে৷

আরও পড়ুন : ৩৪ বছর আগে দেহরক্ষীর গুলিতে খুন হয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী

কয়েক মাস আগের ঘটনা, ফরওয়ার্ড ব্লক ঘোষণা করেছিল, আগামী লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের সঙ্গে বামফ্রন্টের আসন সমঝোতা হলে তা তারা মানবে না৷ একাই লড়বে রাজ্যের ৪২টি লোকসভা আসনে৷ বামফ্রন্ট দলগুলির মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে সিপিএমকে একথা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়ে এসেছিল ব্লক৷ সূর্যকান্তের সাম্প্রতিক বক্তব্যের পরিপ্রক্ষিতে বেজায় চটেছে রাজ্যের ব্লক নেতৃত্ব৷ দলীয় সূত্র খবর, সাংবাদিক সম্মেলন করে সিপিএমকে চরম হুঁশিয়ারি দেওয়ার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছেচে ব্লক৷ রাজ্য সম্পাদক নরেন চট্টোপাধ্যায় বিনা মন্তব্যে বলছেন, ‘‘সাংবাদিক সম্মেলনে আসুন৷ ওখানে সব কথা হবে৷’’ তবে সিপিএমের সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্যের পর ব্লক নেতাদের আলিমুদ্দিনের প্রতি ক্রোধ এখন চোখে পড়ার মতো৷

সিপিআই মনে করছে, অযথা Confusion তৈরি করে আলিমুদ্দিন বাম জোটের ক্ষতি করছে৷ সিপিআই এবং সিপিএম – দুটি দলই পার্টি কংগ্রেসে বিজেপি বিরোধীতার বিষয়ে একমত হয়েছে৷ তার মানে এই নয় পশ্চিমবঙ্গে কী হবে তা ইতিমধ্যেই ঠিক হয়ে গিয়েছে৷ প্রশ্ন উঠেছে ‘উনি’ (সূর্যকান্ত মিশ্র) হঠাৎ কেন একথা বললেন৷ অন্য রাজ্যের পরিপ্রেক্ষিতে যদি বলে থাকেন তবে কলকাতায় একথা বলার কী মানে? রাজ্যের সম্পর্কে যদি বলে থাকেন, তবে বামফ্রন্টে আলোচনা না করে তিনি কীভাবে বলছেন? সিপিআই-য়ের রাজ্য সম্পাদক স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাফ কথা, ‘‘এভাবে Confusion Create করছেন কেন কমরেড সূর্যকান্ত মিশ্র…৷’’ আরএসপির রাজ্য সম্পাদক ক্ষিতি গোস্বামী মনে করেন, ‘‘এটা সিপিএমের পার্টির সিদ্ধান্ত হতে পারে৷ ওরা (সূর্যকান্ত মিশ্ররা) হয়তো আলোচনা করেছেন৷ কিন্তু বামফ্রন্টগত ভাবে এই ধরণের কোনও পলিসি তৈরি হয়নি৷ জানি না কীসের ভিত্তিতে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক এই কথা বলেছেন৷ উনি হয়তো ওদের পার্টির বক্তব্য বলেছেন৷ বামফ্রন্টের নয়৷’’

অধিকাংশ শরিক নেতা মনে করছেন, যেখানে সিপিএম নেই সেখানে যদি বাম মনস্ক ভোটার কংগ্রেসকে ভোট দিতে যান তবে বাকি দলগুলির কী হবে? এরকম বামফ্রন্ট রেখে লাভ কী? শরিক দলের এক নেতার বক্তব্য, ‘‘যা পরিস্থিতি, সিপিএমকে মনে হচ্ছে আমাদের সঙ্গে লড়তে হবে৷ সিপিএমকেই ছাড়ছি না, কংগ্রেসকে কী করে ছাড়ব …৷’’ কিছুদিন আগেই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে যে প্রশ্নটা বারবার ঘুরে ফিরে এসেছে তা হল, কংগ্রেসের সঙ্গে আসম সমঝোতা করে বামদলগুলির কী লাভ হয়েছে৷ কংগ্রেসের ভোট বাদ দলগুলির দিকে আসেনি৷ তা চলে গিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের দিকে৷ নিশ্চিত বামফ্রন্টের ভোটও কংগ্রেস এবং তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে৷ ধ্বসে গিয়েছে বাম দলগুলির ভোট ব্যাংক৷

আরও পড়ুন : মৌলবাদ এবং বাজার অর্থনীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ডাক দিল এসএফআই

যে পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে আলোচনা হয়েছে তা এসেছে ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন থেকে৷ ওই নির্বাচনে সিপিএম ১৯.৮ শতাংশ ভোট পেয়েছিল৷ সিপিএই ১.৫ শতাংশ, আরএসপি ১.৭ শতাংশ এবং ফরওয়ার্ড ব্লক ২.৮ শতাংশ ভোট পেয়েছিল৷ এক সিনিয়ার বামফ্রন্ট নেতার বক্তব্য, ‘‘মহেশতলা উপনির্বাচন দেখলেন তো! যদি কংগ্রেসের ভোট সিপিএম পেত, তবে পার্টি তৃতীয় স্থানে বসে থাকতো না৷ এটা লজ্জার বিষয়৷’’

রাজ্যে সম্প্রতি হয়ে যাওয়া পঞ্চায়েত নির্বাচনে মাত্র একটি (উত্তর দিনাজপুর) জেলা পরিষদ আসন পেয়েছে বামফ্রন্ট৷ কংগ্রেস পেয়েছে ৬টি৷ পরিসংখ্যানের কথা উল্লেখ করে এক বাম শরিক নেতার বক্তব্য, ‘‘সিপিএম ভালোই জানে দাদাগিরির দিন শেষ৷ ফ্রন্টের মুখ রেখেছে শরিকরাই৷’’