শুভমান গিল শচীন তেন্ডুলকরের কন্যা সারাকে ‘ডেট’ করছেন কিনা, কিংবা ঋষভ পন্থের উত্থানে ঋদ্ধিমান সাহার ক্রিকেট ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে গেল কিনা, এই সবই এখন আর আলোচ্য বিষয় নয়। মঙ্গলবর ব্রিসবেনে এই তরুণ ভারতীয় ক্রিকেটাররা যে ইতিহাস তৈরি করলেন, তাই আসলে আধুনিক ক্রিকেটের রূপকথা হিসাবে বেঁচে থাকবে।

সেই রূপকথায় নি:সংশয়ে ঋষভ পন্থ, শুভমান গিল কিংবা মহম্মদ সিরাজরা অবিস্মরনীয় চরিত্র, কারণ যে মাঠে ১৯৮৮-র পর কখনও অষ্ট্রেলিয়া হারেনি, সেইখানে এই নাম না জানা ভারতীয় তরুণরা এমন এক নজির গড়ল যা অতি বড় ক্রিকেট পন্ডিতরাও পূর্বাভাষ দিতে পারেননি।

লিখলেন– সুমন ভট্টাচার্য

ক্রিকেটের সামান্য ভক্ত হিসাবে আমি চিরকাল মনে মনে ভাবি প্রতিটা প্রজন্মের আসলে কিছু ‘ক্রিকেট মিথ’ থাকে। আমাদের প্রজন্মে যেমন বিশ্বকাপে কপিলের জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে করা ১৭৫ বা গাভাস্কারের ওভালে করা ২২১ চিরকাল হৃদয়ের কুঠুরিতে প্রেমের গোপন চিঠির মতো রয়ে যাবে।

আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য হয়তো বা অনিল কুম্বলের ভাঙা চোয়াল নিয়ে দুরন্ত বোলিং কিংবা বিশ্বকাপ সেমি ফাইনালে পাকিস্তানের শোয়েব আখতারদের দুরমুশ করে শচীনের অসামান্য ইনিংস মনের মণিকোঠায় আছে। কিন্তু আজকের প্রজন্মের জন্য? আজ যারা স্কুল বা কলেজ পড়ুয়া, তাদের জন্য রূপকথা কোন্ রাউলিং লিখবেন?

মঙ্গলবার ম্যাচ শেষ হওয়ার পর দুই পৃথিবীর দুই তারকার ট্যুইট দেখে মনে হল ভারতীয় ক্রিকেটের তরুণতম প্রজন্মকে নিয়ে তৈরি এই দল, যাঁরা অষ্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ৩৬ রানে অল আউটও হয়ে গিয়েছিলেন, তাঁরাই আবার ২-১ এ সিরিজ জিতে আধুনিক প্রজন্মের জন্য সেরা রূপকথাটি দিয়ে গেলেন।

ওয়েষ্ট ইন্ডিজের মহা তারকা ভিভ রিচার্ডস, যাঁকে আজকের নেটফ্লিক্স দেখা প্রজন্ম হয়তো চেনে মাসাবা গুপ্তার বাবা হিসাবে, তিনি দেখলাম ট্যুইট করে বলেছেন, এটাই টেষ্ট ক্রিকেটের রোমাঞ্চ। ভারতের তরুণ ক্রিকেটাররা টেষ্ট ক্রিকেটের সেই সৌন্দর্য, নাটকীয়তা এবং রোমাঞ্চকে ব্রিসবেনের মাঠে ফিরিয়ে দিয়েছেন।

আর গুগুলের ভারতীয় বংশোদ্ভুত সিইও সুন্দর পিচাইও উত্তেজনা চেপে রাখতে না পেরে ট্যুইট করে ভারতীয় দলকে অবিস্মরণীয় জয়ের জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন। ঋষভ পন্থ, শুভমান গিল, মহম্মদ সিরাজ বা চেতেশ্বর পূজারারা যদি রূপকথার নায়ক হিসাবে ইতিহাসে ঢুকে পড়ে থাকেন, তাহলে অজিঙ্ক রাহানেকে কি বলব?

ক্রিকেট ঐতিহাসিকরা হয়তো তাঁর সঙ্গে আর এক মারাঠি অজিত ওয়াদেকরের তুলনা করতে পারেন, যিনিও টাইগার পতৌদির মতো মহা তারকাকে পিছনে ফেলে যখন ভারতীয় দলের অধিনায়কত্বের দায়িত্ব পান, তখন ওয়েষ্ট ইন্ডিজ এবং ইংল্যান্ডে অবিস্মরণীয় জয় দিয়ে ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসে জায়গা পাকা করে নিয়েছিলেন। তেমনি বিরাট কোহলি এবং রোহিত শর্মার মতো মহা তারকাদের উপস্থিতি সত্ত্বেও এই ২০২১ এর জানুয়ারিতে তিনিই ভারতীয় ক্রিকেট দলের নতুন ‘সেনাপতি’।

একদম সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা রাহানের ইস্পাত কঠিন মানষিকতা, আর ক্রিজ আঁকড়ে থাকার দূর্দমনীয় জেদই বোধহয় এই তুলনায় অনভিজ্ঞ তরুণতর ভারতীয় ক্রিকেট দলের সঙ্গে অষ্ট্রেলিয়ার যাবতীয় পার্থক্য পড়ে দিয়েছে।

ক্রিকেট ইতিহাসে নিশ্চয় লেখা থাকবে টিম পেইনসের এই অষ্ট্রেলিয়া দল ভারতকে হারাতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছিল, মাঠের ভিতরে এবং বাইরে। জসপ্রীত বুমরা এবং মহম্মদ সিরাজকে গ্যালারির থেকে উড়ে আসা গালাগালি সহ্য করতে হয়েছে, তারকা ব্যাটসম্যান স্টিভ স্মিথ জলপানের বিরতিতে ঋষভ পন্থের মতো তরুণ ব্যাটসম্যানের ব্যাটিং গার্ড পা দিয়ে মুছে দিয়েছেন।

এগুলি যদি কোনও না কোনও ধরনের ‘স্লেজিং’ হয়, তাহলে ভারতীয় ক্রিকেটারদের এমনভাবে হোটেলে ‘নিভৃতবাস’-এর রাখা হয়েছিল যে বুকে স্টেন্ট বসিয়ে বাড়ি ফিরেও ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি সৌরভ গাঙ্গুলিকে অষ্ট্রেলিয়া ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে চিঠি-চাপাটি করতে হয়েছিল রাহানেদের ‘বন্দিদশা’ কাটানোর জন্য।

অষ্ট্রেলিয়া সফরের এই যাবতীয় ‘মানসিক যুদ্ধ’কে অতিক্রম করেই কিন্তু অজিঙ্ক রাহানেদের ব্রিসবেনে জয়। তাই মনে করলে হবে না কামিন্সের শর্টপিচ ডেলিভারি শুধু মাঠেই চেতেশ্বর পুজারার শরীরের দিকে ধেয়ে যাচ্ছিল, আসলে অনেক বাউন্সার গোটা সফর জুড়েই এসেছে।

১৯৮৩-র প্রুডেনসিয়াল কাপ জয় এই উপমহাদেশে ক্রিকেট সম্পর্কে যাবতীয় ধারনাকে বদলে দিয়েছিল। ভারত যে ক্রিকেট বিশ্বে ‘সুপার পাওয়ার’ হতে পারে, তার আগে কেউ বিশ্বাস করতো না। ১৯৮৩-র লর্ডস থেকে ২০২১ এর ব্রিসবেন লম্বা রাস্তা।

সেই রাস্তায় অনেক বিতর্ক, অনেক লড়াই ভারতীয় ক্রিকেটের সঙ্গী ছিল। কিন্তু ব্রিসবেনে অজিঙ্ক রাহানেরা প্রমাণ করে দিলেন কেন আজকের ক্রিকেট বিশ্বে ভারতই নিয়ন্ত্রকের জায়গায়।

লাল-নীল-গেরুয়া...! 'রঙ' ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা 'খাচ্ছে'? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম 'সংবাদ'! 'ব্রেকিং' আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের। কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে 'রঙ' লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে 'ফেক' তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই 'ফ্রি' নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.

জীবে প্রেম কি আদৌ থাকছে? কথা বলবেন বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞ অর্ক সরকার I।