ঋতুদা,

আজ উনিশে এপ্রিল| বাঙালির জীবনের সঙ্গে যে কোনো সিনেমার নামকে, কোনো তারিখ কে এইভাবে জড়িয়ে দেওয়া যায়, তা তুমি না আসলে কি আমরা জানতাম?

কিন্তু তুমি কি জানতে আজ, এই ২০২১ এ, এই বাংলায় বেঁচে থাকলে তোমাকে কি ভাবে রগড়ে দেওয়া হতো? প্রকাশ্য সভায় কি ভাবে তোমাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হতো, আর ন্যাকামি করবেন না তো! কিংবা তোমাকে বারমুডা পরার পরামর্শ দেওয়া হতো!

ওহো,ভুল বললাম| এই সবগুলোই তো বাঙালি মহিলাদের জন্য বরাদ্দ আজকের বাংলায়| পুরুষ আর নারীর যে সীমান্তরেখায় তুমি দাঁড়িয়ে জীবনকে দেখতে চেয়েছিলে, তোমার সেই অস্তিত্বের জন্য হয়তো আরো কদর্য শব্দ অপেক্ষা করছিল!

একবার সিনেমার এক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তোমার এই অস্তিত্ব, তোমার এই সাজপোশাক নিয়ে একজন বিদূষক রঙ্গরসিকতা করেছিল বলে তুমি অপমানিত হয়েছিলে| রাতে উত্তেজিত ঋতুপর্ণ ঘোষ, যে পরিচালকের সঙ্গে সিনেমা করতে চেয়ে স্বয়ং অমিতাভ বচ্চনকে কাতর টেক্সট করতে দেখেছি, সেই ঋতুপর্ণকে অপমানে, দুঃখে অস্থির হতে দেখেছিলাম|

ভরা কৌরবসভায় দ্রৌপদীর অপমান টা মনে আছে রে? আজ আমার সেইরকম মনে হচ্ছিল, জানিস…ঋতুপর্ণ ঘোষ, সেইদিন, সেই রাতে আমি তোমার ইন্দ্রানী পার্কের বাড়িতে, চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুফোঁটায় আহত বাঘিনীকে দেখেছিলাম….

কিন্ত বেঁচে থাকলে আজ তুমি কি করতে ঋতু দা? নিজের পদবীটার জন্য লজ্জিত হতে? ঘোষ পদবীর কারও অবিমৃষ্যকারিতায় রেগে গিয়ে মাঝে মাঝে যেমন মন্তব্য করতে, সেইরকমই কিছু বলতে? না, আরও রেগে গিয়ে বিভিন্ন রামায়ণ আর মহাভারত সেলফ থেকে নামিয়ে পড়তে বসে যেতে, আর বলতে, ওদের কে ওদের অস্ত্র দিয়েই ঘায়েল করতে হবে, বুঝলি…

আজ ১৯ এপ্রিল…ঋতুদা….১৯ এপ্রিল….তুমি কি ডায়াল করে কথা বলতে তোমার নায়িকার সঙ্গে? জিজ্ঞেস করতে কোন অভাববোধ থেকে, কোন একাকীত্বে তিনিও চলে গিয়েছিলেন গেরুয়া শিবিরে নাম লেখাতে? ভগ্নমনোরথ হয়ে ফিরে এসে কেমন আছেন তিনি?

নাকি টেলিভিশনে তোমার এক নায়কের নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে সংলাপ আওড়ানো দেখতে দেখতে বুঝতে পারতে, গিরিপথে খারাপ হয়ে যাওয়া গাড়ির সামনে থেকে তুমি তাঁকে আসলে উদ্ধার করে আনতে পারোনি? যেমনভাবে স্বগতোক্তি করে বলতে, সেইভাবেই আজও আবার উচ্চারণ করতে, বুঝল না রে কিসের জন্য লোকে ওকে মনে রাখবে! সেই সস্তা,চটুল সংলাপ বলাতেই নিজেকে আটকে রাখল….

ঋতুপর্ণ ঘোষ, তোমার সহকর্মীদের গড্ডালিকা প্রবাহে ভেসে যাওয়া দেখে, প্রলোভনে বিকিয়ে যাওয়া দেখে নিশ্চয়ই দুঃখিত হতে| লজ্জিত হতে| ক্রুদ্ধ হতে| তারপর? তারপর কি করতে ঋতুদা? আরেকবার অন্তরমহল বানানোর কথা ভাবতে? না দহন?

নিশ্চয়ই সবাইকে আরেকবার স্মরণ করিয়ে দিতে তারাশঙ্কর কিংবা বিভূতিভূষণ পড়ার জন্য| আর অনন্যা চক্রবর্তীর জীবন থেকে নেওয়া বাঙালি নারীর গল্প দিয়ে আমাদের হয়তো বোঝাতে বাঙালি পুরুষের পুরুষত্ব যেন শুধু মাসল ফোলানোয় সীমাবদ্ধ না থাকে|

স্পষ্ট করে বলে দিতে নিশ্চয়ই নারীকে অপমান করে কোনো সমাজ বা রাষ্ট্র এগোতে পারে না…বাঙালির বুদ্ধি, বাঙালির মননশীলতাকে রগড়ে দেওয়া থামাতে আর কিই বা করতে পারতে? আর বাঙালি নারীর হয়ে প্রত্যুত্তর দেওয়ার জন্য রোববার এর সম্পাদকীয় তে কি লিখতে?

যাই লিখতে তুমি, তার থেকে আমরা কিছু শিখতাম| বাঙালি শিখত| আর আসল ঘোষ এন্ড কোম্পানির এপিসোড আমরা দেখতে পেতাম|

লাল-নীল-গেরুয়া...! 'রঙ' ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা 'খাচ্ছে'? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম 'সংবাদ'! 'ব্রেকিং' আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের। কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে 'রঙ' লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে 'ফেক' তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই 'ফ্রি' নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.