ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত ছবি

পুলকেশ ঘোষ: 

বাংলায় তাবড় সংবাদপত্র লিখেছে, ভারতীয় বায়ুসেনা পাক অধিকৃত কাশ্মীরের অনেকটা ভিতরে গিয়ে হাজার কেজির বোমা মেরে শ’তিনেক জঙ্গি নিকেশ করে এসেছে। এই তথ্য ভুল। ইংরেজিতে হাজার পাউন্ডের বোমার কথা জানিয়েছে বায়ু সেনা তথা কেন্দ্রীয় সরকার। তার মানে কি হাজার কেজি? এক হাজার পাউন্ডে সাড়ে চারশো কেজি হয়। এই হিসেবটা প্রায় সবাই গুলিয়েছে।

এই হাজার পাউন্ডের বোমা আমাদের বায়ুসেনার হাতে অনেকদিন ধরেই আছে। বড় বড় কারখানা, গুদাম, শত্রুর অস্ত্র ঘাঁটি ইত্যাদি ধ্বংসের জন্য এই বোমা ব্যবহার করা হয়। এর ধ্বংস ক্ষমতা প্রচণ্ড। একেকটা বোমার ওজন দেখেই তা আন্দাজ করা যায়। ভারতীয় বায়ু সেনার প্রতিষ্ঠা ১৯৩২ সালে।

১৯৮২ সালে তার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করা হয় ধুমধাম করে। এই উপলক্ষে খড়্গপুরের কাছে বায়ুসেনার একটি ঘাঁটিতে সাংবাদিকদের ‘ফায়ার পাওয়ার ডিসপ্লে’ বা অস্ত্র ক্ষমতা প্রদর্শনের একটি মহড়া হয়েছিল। সেখানে বেশকিছু নকল সেতু, শত্রু ঘাঁটি, বিদ্যুৎকেন্দ্র ইত্যাদি বানিয়ে সেগুলিকে ধ্বংস করার মহড়া দেখানো হয়েছিল। সেই সময়ে আমি এই বোমার অসীম ক্ষমতা দেখেছিলাম। নকল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি মুহূর্তে বোমা মেরে ধূলিসাৎ শুধু নয়, প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল এই বোমা।

ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত ছবি

কিন্তু সেদিনের সেই হাজার পাউন্ড বোমা আর আজকের দিনে ব্যবহৃত হাজার পাউন্ডের বোমার মধ্যেও বিরাট তফাত। আমাদের দেশ বিজ্ঞানে তরতর করে এগিয়ে চলেছে। আমরা এখন শুধু বিদেশ থেকে কেনা অস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল নই। এই হাজার পাউন্ড বোমা আজ লেসার চালিত। অর্থাৎ একেবারে নিখুঁত লক্ষ্যে আঘাত হানার ব্যাপারে চোখ বন্ধ করেই ভরসা করা যায়। এর এখনকার নাম হল ‘সুদর্শন’।

এটি আমাদের দেশের প্রথম সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি লেসার চালিত বোমা। ২০০৬ সালে এরোনটিক্যাল ডেভেলপমন্ট এস্টাব্লিশমেন্ট, ইনস্ট্রুমেন্ট রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এস্টাব্লিশমেন্ট এবং দিল্লি আই আই টি-র ইঞ্জিনিয়াররা এটির ডিজাইন করে। ২০১৩ সালে এটি প্রথম ব্যবহৃত হয়।

লেসার পরিচালিত বোমাগুলিকে বলা হয় স্মার্ট বম্ব। অনেকটা পকেটে থাকা স্মার্ট ফোনের মতোই। অনেকের স্মার্ট ফোনেই জাইরো সেমসর থাকে। এই বোমাতেও এই ধরনের সেনসর থাকে। মানুষ যে গতিবিধি নির্ণয় করতে পারে না, এই সেনসর তা অনায়াসে পারে।

প্রচণ্ড দ্রুতগতির বিমান থেকে যে লেসার টার্গেটের ওপর প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসে, সেই পথকে চিনে নেয় এই বোমার নাকের ডগায় বসানো একটি যন্ত্র। ততক্ষণে বিমানের সঙ্গে সঙ্গে তার পেটে থাকা বোমার অবস্থান বদলে গেলেও অঙ্ক কষে তা নিজেই বের করে একেবারে নির্ভুল লক্ষ্যে আঘাত হানে সুদর্শন। এই বোমা আমাদের গর্ব। এবারের অভিযানে সুদর্শন অপারেশনে গিয়েছিল মিরাজে চেপে। কিন্তু এছাড়াও মিগ-২৭, জাগুয়ার ইত্যাদি বিমানেও এই বোমা ব্যবহার করা যায়।

শত্রু নিধনে এই অত্যাধুনিক বোমার জুড়ি মেলা ভার। বড় বড় শক্তপোক্ত নির্মাণ এই হাজার পাউন্ড বোমার প্রতিঘাতে গুঁড়িয়ে শেষ হয়ে যায় নিমেষে। আমি যখন এই বোমার কার্যকারিতা দেখেছিলাম তখনই আমাদের বিজ্ঞানী ও ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য খুব গর্ব হয়েছিল। কিন্তু তখনও ভাবিনি যে সেই বোমার কার্যকারিতাকে লেসার চালিত করে ও সেনসর দিয়ে এত নির্ভুল লক্ষ্যে আঘাত হানার মতো ‘স্মার্ট’ করা যাবে। আজ তাই ভারতীয় বায়ু সেনার সাহসী পাইলটদের পাশাপাশি সেই সব বিজ্ঞানী ও ইঞ্জিনিয়ারদের সমস্ত ভারতবাসীর তরফ থেকে আমার কুর্ণিশ।

জয় হিন্দ!