স্টাফ রিপোর্টার, হলদিয়া: সারা দেশের শ্রেষ্ঠ মাছ চাষিদের মধ্যে জায়গা করে নিল রাজ্যের তিন মৎস্যচাষি, তিনজনই পূর্ব মেদিনীপুর জেলার হলদিয়ার বাসিন্দা৷ নিত্য নতুন অভিনব পদ্ধতির সফল প্রয়োগ, জৈব উপায়ে পরিবেশ বান্ধব চাষ ও বৈচিত্রময় মাছের সফল চাষে হলদিয়া রাজ্যে রোল মডেল। এখন শুধু রাজ্যে নয় সারা দেশে মাছ চাষে এক নতুন পথ দেখাচ্ছে হলদিয়া।

আমুর, মিল্ক ফিস, গিফট তেলাপিয়া, পেংবার মতো নতুন নতুন মাছের সফল চাষ হয়েছে হলদিয়ায়। আবার মাগুর, শিঙি, কৈ , পাবদার , গুলসা টেংরার মতো হারিয়ে যাওয়া মাছের বানিজ্যিক চাষ করে তাক লাগিয়ে দিচ্ছে হলদিয়ার মাছ চাষিরা। চাষে ব্যাবহার করছে জৈব জুস। বিভিন্ন জাতীয় মাছের পরিবেশবান্ধব জৈব্য প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে চাষ করে হলদিয়ার মাছ চাষিরা এখন শুধু রাজ্যেও নয় দেশের সেরা।

হলদিয়া ব্লক মৎস্য সম্প্রসারন আধিকারিকের কাছে জাতীয় সেরা মাছ চাষির স্বীকৃতি সংক্রান্ত চিঠি এসে পৌছেছে৷ বুধবার ১০ই জুলাই ২০১৯ “কেন্দ্রীয় মিষ্টি জলের মাছের গবেষনা কেন্দ্র” ( সেন্ট্রাল ইন্সটিটিউট অফ ফ্রেস ওয়াটার একুয়াকালচার ) এর মৎস্যচাষি দিবস অনুষ্ঠানে মৎস্য চাষের সফলতার স্বীকৃতি স্বরূপ সারা দেশের বাছাইকরা সেরা মাছ চাষিদের দেওয়া হবে শ্রেষ্ঠ সম্মাননা।

মাছ চাষে ‘শ্রেষ্ঠ সম্মাননা’ অর্জন করতে ওডিশার ভুবনেশ্বরে অবস্থিত রাষ্ট্রীয় মৎস্য গবেষনা কেন্দ্রের উদ্দেশে পাড়ি দিয়েছেন রাজ্যের তিন জন মাছ চাষি৷ পূর্ব মেদিনীপুর জেলার হলদিয়া ব্লকের দ্বারিবেড়িয়া গ্রামের অরুপ মন্ত্রী, বসান চক গ্রামের শরত চন্দ্র ভৌমিক, ও ডিঘাসিপুর গ্রামের কৃষ্ণ প্রসাদ সামন্ত।

হলদিয়া ব্লকের মৎস্যচাষ সম্প্রসারন আধিকারিক সুমন কুমার সাহু বলেন, প্রায় জৈব পদ্ধতি অবলম্বন করে গুনগতমান বজায় রেখে স্বাস্থ্যকর মাছ উৎপাদন করাই হলদিয়ার মাছ চাষিদের প্রধান বৈশিষ্ট । শুধু মাছ চাষ করে নিজের আয় বাড়ানোটাই মুখ্য নয়, দেশের বিভিন্ন হারিয়ে যাওয়া মাছের বানিজ্যিক চাষের মাধ্যমে আবার ফিরিয়ে আনার এক অদম্য উদ্যোগ রয়েছে মাছ চাষিদের মধ্যে।

পুকুরে মাছ পাড়ে শাক-সব্জী, ফল-মূলের গাছ লাগিয়ে পরিবেশ বান্ধব মাছ চাষের উদ্যোগ গ্রহন করেছে হলদিয়ার মাছ চাষিরা। আর তার সুফল হিসেবে সারা দেশের নজরে আসছেন এই সব মাছ চাষিরা। ফল স্বরূপ জাতীয় সেরা মাছ চাষির স্বীকৃতিও পাচ্ছে। অরূপ মন্ত্রী, শরত ভৌমিক ও কৃষ্ণ প্রসাদ সামন্তের এই স্বীকৃতি অন্যন্য মাছ চাষিদের আরো বেশী করে উৎসাহিত করবে।

দ্বারিবেড়িয়া গ্রামে ভাই পঞ্চানন মন্ত্রীর সাথে যৌথ ভাবে মাছ চাষ করেন অরুপ মন্ত্রী। প্রায় ৪৫বিঘা বা ৮ হেক্টর জলাশয়ে মাছের চাষ। আরো বাড়াচ্ছেন। সম্পূর্ণ জৈবিক পদ্ধতিতে হলুদ, নীম , জৈব জুস প্রয়োগ করে মাছ চাষ করেন। সম্প্রতি মনিপুরের পেংবা মাছের সফল চাষ করেছেন। নিয়মিত নিবিড় যোগাযোগ রেখে চলেন হলদিয়া ব্লক মৎস্য দপ্তরের সাথে। মাছ চাষের প্রশিক্ষনও পেয়েছেন। খুব অভাবের সংসার ছিল অরুপ মন্ত্রীর। প্রথমে নিজের ছোট পুকুরে মাছ চাষে নামে দুই ভাই। ধীরে ধীরে মাছ চাষে সফল হতে থাকে৷

হলদিয়া ব্লকে মৎস্য দফতরের সাহায্যে সরকারি আর্থিক অনুদান সহ রাষ্ট্রায়াত্ব ব্যাঙ্ক থেকে ঋন পেয়ে মাছ চাষের পরিধি আরো বাড়ান। গত বছর রুই, কাতলা, মৃগেল প্রভৃতি কার্প জাতীয় মাছের অধিক ফলন করায় ব্লকের সেরা মাছ চাষির পুরস্কারও পান।

বসানচক গ্রামে প্রায় ৮ হেক্টর জলাশয়ে শরত চন্দ্র ভৌমিকের মাছের চাষ। পেংবা মাছের সফল চাষ করে সারা দেশের নজরে এসেছেন। এছাড়া হারিয়ে যাওয়া পাবদা মাছের সফল চাষ করে সারা রাজ্যে সাড়া ফেলেছেন তিনি। রুই, কাতলা, মৃগেল, গলদা চিংড়ি, পার্শে প্রভৃতি বড় মাছের অধিক উৎপাদন করে চলেছেন। হলদিয়া ব্লক মৎস্য দপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও প্রশিক্ষন পেয়েছেন। ছেলে, মেয়ে স্ত্রীকে নিয়ে এক সাথেই মাছ চাষের তদারকি করেন তিনি৷

মিশ্র পদ্ধতির চাষে রুই, কাতলা, মৃগেল, ভেটকি, চিতল, গলদা, বাগদা হরেক মাছের চাষ করেন আর একজন মাছ চাষি কৃষ্ণপ্রসাদ সামন্ত। ৬-৭টি জলাশয়ে তার এই চাষ। তবে সব লীজ নিয়ে। হলদিয়া ব্লক মৎস্য দফতর থেকে মাছ চাষের প্রশিক্ষন পেয়েছে। “ক্রমান্বয়ে মাছ ছাড়া ও ক্রমান্বয়ে মাছ ধরা”- এক নতুন পদ্ধতির মাছ চাষের প্রদর্শনী ক্ষেত্র কৃষ্ণপ্রসাদের পুকুরে স্থাপন করেছিল মৎস্য দফতর।

কেবল শুধু সফল ভাবে এই প্রকল্পের রূপায়ন করেছেন তাই না আশে পাশের মাছ চাষিদেরও উৎসাহী করেছেন। বাবা প্রজাপতি সামন্ত ছিলেন একজন সফল মাছ চাষি । বাবা মারা যাওয়ার পর চাষে নামে ছেলে কৃষ্ণ প্রসাদ সামন্ত। তবে পাশের গ্রাম বাড়-ঘাসিপুরে লীজ নিয়ে মাছ চাষের ক্ষেত্র আসতে আসতে বাড়ান। বিভিন্ন ধরনের খাওয়ার মাছ যেমন তৈরি করে তেমনি ছোট চারা পোনা উৎপাদন করে বিক্রি করেন। সেই সব চারা কিনে নিয়ে যায় আশে পাশের মাছ চাষিরা। এছাড়া পুকুর পাড়েই বসিয়েছেন গম ভাঙা মেসিন। সেখান থেকেও উপার্জন।

মিল্ক ফিস মাছের ভালোই উৎপাদন করেছিলেন কৃষ্ণ প্রাসাদ। সব মিলিয়ে প্রায় ৪ হেক্টর জলাশয়ে জৈবিক পদ্ধতিতে মাছ চাষ করেন। মাছ চাষের পরামর্শের জন্য নিয়মিত ব্লক মৎস্য দফতরে যোগাযোগ রেখে চলেন৷ বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে ব্লক মৎস্য দফতর থেকে সাহায্য পেয়ে মাছ চাষের অগ্রগতি ঘটিয়েছেন।

হলদিয়া ব্লকের বিডিও তুলিকা দত্ত ব্যানার্জী, হলদিয়া পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি সুব্রত হাজরা ও মৎস্য কর্মাধ্যক্ষ গোকুল মাঝি মাছ চাষিদের শুভেচ্ছা জানান। মাছ চাষিদের পাশে ব্লক প্রশাসন সর্বদা পাশে আছে বলে জানান।

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ