সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়: অভিনন্দন বর্তমান যখন ওয়াঘা সীমান্তে অপেক্ষা করছিলেন পাক সীমান্ত থেকে ভারতে প্রবেশ করার আগে তখনও তাঁর চোখ মুখ ছিল আত্মবিশ্বাসে ভরা। আজ শক্তিশালী ভারতীয় সেনার আত্মবিশ্বাসী ভাবটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেদিন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ অন্য ছিল। তবুও তরুণ বাঙালির বুক ছিল আত্মবিশ্বাসে ভরপুর।

না হলে , এক ঝাঁক ব্রিটিশদের মাঝে একমাত্র ভারতীয় হিসাবে ব্রিটিশ অধীনস্থ ভারতের বায়ু সেনায় যোগদান করা সহজ কথা নয়। বাঙালির ছেলে, যুদ্ধে যাবে। তাও আকাশ পথে! মা ভয়ে পেয়েছিলেন। এখানেও সেই প্রবল আত্মবিশ্বাস। চিঠিতে লিখেছিলেন ,‘নিশ্চিন্তে থেকো। কখনও আমার বিমান ভেঙে পড়বে না।’ হয়ওনি কখনও। তিনিই হন ভারতের প্রথম বায়ুসেনার প্রথম ভারতীয় এয়ার চিফ। তিনি সুব্রত মুখোপাধ্যায়।

ভারতের বায়ু সেনা। সেখানে রয়েছেন কারা ? সবাই ব্রিটিশ। একজন বাদে। তিনি সুব্রত মুখোপাধ্যায়। ভারতের উচ্চপদস্থ সেনা অফিসার হিসেবে ভারতীয়দের ক্ষমতাকে আর অস্বীকার করতে পারছিল না তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার। বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকের প্রথম দিক। ব্রিটিশ সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এয়ারফোর্সে ভারতীয়দের নেওয়া হবে। তার আগে কোনও ভারতীয়কে এই জায়গা দেওয়া হতো না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কিছু আগে থেকে এই পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। তরুন সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের বাবা সতীশ চন্দ্র মুখোপাধ্যায় ব্রিটিশদের এই সিদ্ধান্তের কথা ছেলেকে জানিয়েছিলেন। রাজি ছিলেন সুব্রত। কারণ বিমান চালনাকেই পেশা হিসেবে নিতে চেয়েছিলেন তিনি। তবে ছেলের এমন সিদ্ধান্তে মোটেই খুশি হননি তাঁর মা চারুলতা দেবী। তখনই অভয় দিকে মা’কে চিঠিতে বলেছিলেন, ‘কখনও আমার বিমান ভেঙে পড়বে না।’ মূলত সম্পর্কে কাকা ইন্দ্রলাল রায়, যিনি ব্রিটিশ ভারতের রয়্যাল ফ্লাইং কোর দলে ছিলেন, তাঁকে দেখেই অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন সুব্রত।

১৯৩২ সালের ৮ অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত হয় ‘রয়্যাল ইন্ডিয়ান এয়ারফোর্স’। সেই বাহিনীতেই নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করে শীর্ষস্থানে জায়গা করে নেন সুব্রত মুখোপাধ্যায়। কর্নওয়েলের RAF কলেজে পাইলট ট্রেনিংয়ের জন্য নির্বাচিত হওয়া ছয় জনের মধ্যে সুব্রত ছিলেন অন্যতম। ভারতের বিমান বাহিনীকে ২৮ বছর ধরে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানে পৌঁছে দিয়েছিলেন ভারতীয় বায়ুসেনাকে।

দু’বছরের ট্রেনিং হয় তাঁর। ছ’জনের মধ্যে তিনি ছাড়া ছিলেন এইচসি সরকার, এবি আওয়ান, ভুপেন্দর সিং, অমরজিৎ সিং এবং জেএন টন্ডন। এতদিন পর্যন্ত শুধু খাতায়-কলমেই ছিল ভারতের এয়ারফোর্স। সেটা বাস্তবায়িত হওয়ার স্বপ্নও দেখেনি কেউ। এই ছ’জনই সেই বাস্তবকে রূপ দেওয়ার পথে এগিয়েছিলেন। ১৯৩৩ সালে সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের প্রথম পোস্টিং ছিল অবিভক্ত ভারতের করাচিতে। ১৯৩৬ সালে ভারত – আফগান সীমানার নর্থ ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টিয়ারে ভারতের হয়ে যুদ্ধে তাঁর ভূমিকা প্রশংসিত হয়েছিল। ১৯৩৯ এবং ১৯৪৩ সালে প্রথম ভারতীয় হিসাবে স্কোয়াড্রন লিডার এবং এয়ার ফোর্স কমোডর হন তিনি। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর হন ভারতের ডেপুটি চিফ এয়ার স্টাফ। ১৯৫৪ সালে হন এয়ার চিফ মার্শাল।

সুব্রত মুখপাধ্যায়ের দেখানো পথের পথিক তাঁর সাম্প্রতিক উত্তরসূরী সদ্য প্রাক্তন বাঙালি বায়ুসেনা প্রধান অরূপ রাহা। ভারতীয় বিমান বাহিনীর ২৪তম প্রধান কর্মকর্তা হিসেবে ৩১ ডিসেম্বর ২০১৩ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০১৬ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। ১৯৬০ সালে একটি টেকনিক্যাল মিশনের প্রধান হয়ে জাপানে গিয়েছিলেন সুব্রত মুখপাধ্যায়। সেখানে একটি রেস্তোরাঁয় খাওয়ার সময় শ্বাসনালীতে খাবার আটকে দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাঁর মৃত্যু ঘটে। বায়ুসেনার ইতিহাসে তাঁর নাম আজও উজ্জ্বল।

কিছুদিন আগে পাক অধিকৃত কাশ্মীরের বালাকোটে ভারতের এয়ার স্ট্রাইকের পর বায়ুসেনাদের নিয়ে হইচই পরে যায়। সম্প্রতি পাক বিমান F-16কে মেরে নামিয়ে দেওয়া ভারতীয় বায়ু সেনার অন্যতম সাফল্য। অভিনন্দন বর্তমান সেই সাফল্যের অন্যতম প্রমাণ। তাঁর আত্মবিশ্বাসী চেহারায় যেন প্রথম এয়ার চিফ মার্শালেরই ছায়া।