সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় , বোলপুর : ভাঙো অচলায়তন’ এই আওয়াজ তুলে শুক্রবার পথে নামল বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীরা। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির আবেদন ফি অস্বাভাবিক বৃদ্ধির প্রতিবাদে তাদের এই আন্দোলন। যাদবপুর থেকে প্রেসিডেন্সি কলেজ বহুবার ছাত্র আন্দোলনের শিকার হয়েছে। উপাচার্যকে ঘরবন্দি করে আন্দোলনের চিত্র বারবার দেখেছে শহর কিন্তু রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন সেদিক থেকে শান্ত। তেমন কোনও বড় ছাত্র আন্দোলন সাম্প্রতিককালে দেখা যায়নি। সেই বিশ্বভারতীর ছাত্র-ছাত্রীরা এবার বিরাট আন্দোলন নেমেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন অতিরিক্ত বাড়িয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে।

ভিতরে ভিতরে প্রতিবাদ বেশ কিছুদিন ধরেই চলছিল। শুক্রবার ঐক্য মঞ্চের তলায় শামিল হয় অসংখ্য পড়ুয়া। অবিলম্বে কমাতে হবে ভর্তির আবেদন ফি এই দাবি নিয়ে উপাচার্যকে স্মারকলিপি জমা দিতে যায় পড়ুয়ারা। পড়ুয়াদের উপাচার্যের দফতরে ঢুকতে বাধা দিলে নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে বচসায় জড়িয়ে পড়েন পড়ুয়ারা। এরপরে রাস্তায় রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে প্রতিবাদ শুরু করেন প্রতিবাদী পড়ুয়ারা। আশ্রম এলাকা জুড়ে চলে গান গেয়ে মিছিল। ছাত্রছাত্রীরাদের সম্মিলিত দাবী

১.অবিলম্বে ‘Form’-এর মূল্য কমিয়ে ‘Application Form ‘ভর্তির ক্ষেত্রে পুরনো অর্থ কাঠামো বহাল রাখতে হবে।
২.ইতিমধ্যেই যে Form গুলি জমা পড়েছে ও Payment সম্পূর্ণ হয়েছে, তাদের নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে টাকা refund করতে হবে।
৩. Admission, semester, hostel fees বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত কর্তৃপক্ষকে পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
৪. ভবিষ্যতে ফিস সংক্রান্ত যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্বে ছাত্রছাত্রীদের সাথে আলোচনা করতে হবে।
ছাত্রছাত্রীদের পক্ষে জানানো হয়েছে , বিশ্ববিদ্যালয়ের মান রক্ষা করতে এবং এই অচলায়তন ভাঙতে ছাত্র, শিক্ষক,অধ্যাপক , অশিক্ষা কর্মচারী থেকে শুরু করে সকল সচেতন ব্যাক্তিবর্গকে নিয়ে আন্দোলনে নেমেছে পড়ুয়ারা।

বিশ্বভারতীর ছাত্র ছাত্রীদের সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রতি বছরের মতোই এই বছর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরে ভর্তির অনালাইন আবেদনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে গত ০৮.০৫.১৯ তারিখে। সব আগের মতো থাকলেও , শুধু ‘Application Fees’ বেড়ে গিয়েছে প্রায় ১০০%। এছাড়া Course fee (Admission fees এবং semester fees) হঠাৎ বৃদ্ধি পেয়েছে একই হারে। আন্ডার গ্রাজ্যুয়েট ও পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কোর্সের ক্ষেত্রে ফি দ্বিগুণ হয়েছে। বিভিন্ন হোস্টেলের মাসিক খরচও আগের তুলনায় অনেকটা বাড়িয়েছে কর্তৃপক্ষ। এর জেরে সমস্যায় পড়েছে আন্তর্জাতিক ছাত্রছাত্রীরা। Application Fees এবং Admission Fees বেড়েছে তাদেরও।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘SAARC’ অন্তর্ভুক্ত উন্নয়নশীল দেশের পড়ুয়াদের সংখ্যাই বেশি। তাই ইউরোপ , মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাদে বাকি অন্যন্য উন্নয়নশীল দেশের বিদেশী ছাত্রছাত্রীদের ক্ষেত্রে ১২হাজার টাকার ‘Equivalent form’ ( উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে যা Association Of Indian Universities এর থেকে সংগ্রহ করতে হয়) ও ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে ‘application form’ ভর্তি করা যথেষ্টই দুরূহ হচ্ছে বলে জানাচ্ছে আন্দোলনকারীরা। ছাত্র ছাত্রীদের দাবী সবটাই হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অর্থভান্ডার তৈরির করার দোহাই দিয়ে।

আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীদের প্রশ্ন এতোটা আর্থিক বোঝা চাপানো কতখানি যুক্তিযুক্ত ? তারা মনে করছে, ভরতি প্রক্রিয়ায় এমন মূল্যবৃদ্ধি স্বাভাবিক ভাবেই শিক্ষার বেসরকারিকরনের প্রথম পদক্ষেপেরই ইঙ্গিত। পড়াশোনার খরচ প্রচুর বেশি বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে। প্রায়ই খবর মেলে বিশাল অর্থের বিনিময়ে ছাত্রছাত্রী ভরতি নেওয়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির শিক্ষার মান নিম্ন। ছাত্র ছাত্রীদের আশঙ্কা , এই আঁচ বিশ্বভারতীর গায়ে লাগলে বিশ্বকবির তৈরি শিক্ষাঙ্গনের পড়াশোনার মান কমে যাবে।

১৯০১ সালে,ব্রিটিশদের তৈরী শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ গড়ে তুলছিলেন এই পাঠভবন, যার মধ্যে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বীজ নিহিত ছিল। উদ্দেশ্য ছিল মুক্ত চিন্তা ও শিক্ষার বিকাশ ঘটিয়ে কেরানি তৈরির নয় , ‘পরিপূর্ণভাবে বেঁচে থাকার শিক্ষা’ দেওয়া। আশেপাশের গ্রামের দুঃস্থ পরিবারের ছেলেমেয়েদের জীবিকা নির্ভর শিক্ষাদানও ছিল অন্যতম উদ্দেশ্য। ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। প্রথম থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন ছিল সমস্ত শ্রেণীর ও আর্থিক স্তরের ছাত্রছাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত। অর্থ, শ্রেণী, লিঙ্গ পরিচয় কোনোদিন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি। বিশ্ববিদ্যালয় জন্ম দিয়েছে সত্যজিৎ রায়, নন্দলাল বসু, রামকিঙ্কর বেজ ,অমর্ত্য সেন প্রমুখ নক্ষত্রের। বিশ্ববিদ্যালয়ের আদর্শ, আশ্রমিক পরিবেশ উজ্জীবিত করেছে অসংখ্য মানুষকে, হয়েছে অনেক নতুন সৃষ্টির প্রেরণা। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ছাত্রছাত্রীদের অন্যতম আকর্ষণ এই বিশ্ববিদ্যালয় বিশাল প্রশ্নের মুখে।