প্রতীকী ছবি৷

বিশ্বজিৎ ঘোষ, কলকাতা: রাস্তার সারমেয়কে পিটিয়ে খুন করা হয়েছে৷ অভিযোগ এমনই৷ এবং, ওই অভিযোগের ভিত্তিতে শুরু হয়েছে পুলিশি তদন্ত৷ এই ঘটনা কলকাতার৷ আর, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফের প্রকাশ্যে এল যে, কোনও পশু এমনকী রাস্তার কোনও সারমেয় অথবা মার্জারের উপরও কোনও মানুষ অত্যাচার করলে, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে পুলিশ৷

যদিও, রাস্তার সারমেয়কে পিটিয়ে খুন করা হয়েছে, এই ধরনের অভিযোগ প্রথমে নিতেই চায়নি পুলিশ৷ বরং, অভিযোগকারীদের সঙ্গে পুলিশ প্রথমে দুর্ব্যবহার করে বলেই অভিযোগ উঠছে৷ যে কারণে, ওই অভিযোগ নেওয়ার জন্য পুলিশের কাছে কয়েকটি ফোন-ও যায়৷ যার মধ্যে রয়েছে অভিনেত্রী দেবশ্রী রায়ের ফোনও৷ এবং, ওই চাপের জেরেই, শেষ পর্যন্ত পুলিশ অভিযোগ নেয় বলে জানা গিয়েছে৷ এবং, এমনও জানা গিয়েছে, ওই চাপের জেরেই শুধুমাত্র যে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়েছে তাই-ই নয়, এফআইআর দায়ের করে তদন্ত-ও শুরু করেছে৷ এই ঘটনা হরিদেবপুর থানার৷

এই প্রসঙ্গে মানেকা গান্ধীর সংগঠন ‘পিপল ফর অ্যানিম্যালস’-এর পশ্চিমবঙ্গ শাখার সভাপতি প্রসেনজিৎ দত্ত বলেন, ‘‘প্রথমে অভিযোগ নিতে অস্বীকার করেছিলেন হরিদেবপুর থানার এক পুলিশ আধিকারিক৷ তবে, কুকুর তথা পশুদের প্রতি সহানুভূতি সম্পন্ন দুই পুলিশ আধিকারিকের সঙ্গে ফোনে কথা বলার পর, নেওয়া হয় অভিযোগ৷ তার পরে এই বিষয়ে আগ্রহ দেখান ওই থানার অফিসার ইনচার্জ৷’’ এবং, দেবশ্রী রায় বলেন, ‘‘রাস্তার কুকুরদের উপরে যেভাবে অত্যাচার হচ্ছে, সেটা সহ্য করা যায় না৷ আজ কুকুর মারছে, কাল মানুষ মারবে৷ অবলা প্রাণী বলে ওদের উপর অত্যাচার করতে হবে? পুলিশ অভিযোগ নিচ্ছিল না৷ সেই জন্য ফোন করেছিলাম৷’’ প্রথমে অভিযোগ নিতে না চাওয়ার প্রসঙ্গটি অবশ্য এড়িয়ে গিয়েছেন হরিদেবপুর থানার অফিসার ইনচার্জ দেবতোষ বসাক৷ তবে, তিনি বলেন, ‘‘কুকুরের মৃত্যুর ঘটনায় কেস নেওয়া হয়েছে৷ ওই ঘটনার তদন্ত চলছে৷’’

কলকাতা পুলিশের অধীনে হরিদেবপুর থানা এলাকার বেহালা কালীতলা গভর্মেন্ট হাউসিং ফেজ-দুই-য়ে গত আট অগস্ট চারটি সারমেয়কে নিষ্ঠুরভাবে পেটানো হয়েছে৷ এই খবর পৌঁছয় স্থানীয় দুই পশুপ্রেমী তিতাস মুখোপাধ্যায় এবং সোমক চট্টোপাধ্যায়ের কাছে৷ এই প্রসঙ্গে সোমক চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘ওই চারটি কুকুরকে এমনভাবে পেটানো হয়েছিল, তার জন্য ওরা মারাত্মক রকমের জখম হয়েছিল৷ আমরা দু’টি কুকুরকে উদ্ধার করে নিয়ে আসি৷ ওরা সব থেকে বেশি জখম হয়েছিল৷ কিন্তু, শেষ পর্যন্ত একটি কুকুরকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি৷ অন্য কুকুরটির চিকিৎসা চলছে৷ তার শারীরিক অবস্থা এখনও আশঙ্কাজনক৷ অন্য দুই কুকুরেরও চিকিৎসা চলছে৷ ওই আবাসন চত্বরেই তাদের রাখা হয়েছে৷’’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘যেভাবে পিটুনির ফলে এক কুকুরের মৃত্যু হল, সেটা ওই কুকুরকে খুন করা ছাড়া অন্য আর কী হতে পারে? চিকিৎসকও বলেছেন, এমন নিষ্ঠুরভাবে পেটানো হয়েছে, তার জন্যেই ওই কুকুরের মৃত্যু হয়েছে৷ তাই, ওই কুকুরকে খুন করা হয়েছে বলে পুলিশে অভিযোগ করেছি৷’’

প্রসেনজিৎ দত্ত বলেন,  ‘‘যে দু’টি কুকুর মারাত্মকভাবে জখম হয়েছে, তাদের মধ্যে একজন মা এবং অন্যজন তার ছেলে৷ তবে, ওই বাচ্চা কুকুরটিকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি৷ গত ১০ অগস্ট সে মারা যায়৷ ওর মায়ের শারীরিক অবস্থা এখনও আশঙ্কাজনক৷ তার চিকিৎসা চলছে৷’’ এই ঘটনার জেরে গত ১২ অগস্ট তিতাস মুখোপাধ্যায় এবং সোমক চট্টোপাধ্যায় জেনারেল ডায়েরি করতে যান হরিদেবপুর থানায়৷ সোমক চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘অভিযোগ না নিয়ে পুলিশ আমাদের সঙ্গে প্রথমে দুর্ব্যবহার করে৷ সেই জন্য বিষয়টি আমরা দেবশ্রী রায়কে জানায়৷ তার পর আমাদের অভিযোগ নেয় পুলিশ৷’’ জানা গিয়েছে, ওই সারমেয়র মৃত্যুর ঘটনায় কেন অভিযোগ নেওয়া হবে না, সেই প্রসঙ্গ উত্থাপন করে কয়েকটি ফোন যায় ওই থানায়৷ ওই সব ফোনে পুলিশকে জানানো হয়, এ দেশে আইন রয়েছে৷ তার উপর রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশও৷ তার পরেই, অভিযোগ নেয় পুলিশ৷

শুধুমাত্র তাই নয়৷ জানা গিয়েছে, ওই সব ফোনের চাপে পড়ে-ই বেড়ে যায় পুলিশের তৎপরতা৷ এবং, যে কারণে, অভিযোগের পরের দিন, গত ১৩ অগস্ট ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত শুরু করে পুলিশ৷ ওই আবাসনের সেক্রেটারি এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গেও পুলিশ কথা বলে৷ তবে, মৃত ওই সারমেয়র ঘাতক হিসেবে এখনও পর্যন্ত পুলিশ কাউকে চিহ্নিত করতে পারেনি৷ যে কারণে, ঘটনাস্থল থেকে ফেরার পর, অজ্ঞাত পরিচয়ের ঘাতকের বিরুদ্ধে পুলিশ এফআইআর (নম্বর: ৩৮২ তারিখ ১৩.০৮.২০১৫) করেছে৷ প্রসেনজিৎ দত্ত বলেন, ‘‘ওই কুকুরের মৃত্যুর জন্য প্রিভেনশন অফ ক্রুয়েলটি টু অ্যানিম্যালস অ্যাক্ট, ১৯৬০ এবং ইন্ডিয়ান পিনাল কোড (আইপিসি)-এর ৪২৮-এর ১১(১)(এ) অনুযায়ী, অজ্ঞাত পরিচিত আততায়ীর নামে পুলিশ এফআইআর করেছে৷’’

সোমক চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, ‘‘ওই আবাসন চত্বরেই আগেও বিভিন্ন সময় কখনও বড় কুকুর কখনও আবার তাদের ছানাদের উপর অত্যাচার করা হয়েছে৷ আমরা চাই, যে বা যাঁরা ওই কুকুরটিকে পিটিয়ে খুন করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী পুলিশ ব্যবস্থা গ্রহণ করুক৷’’ এখানেও শেষ নয়৷ প্রসেনজিৎ দত্ত বলেন, ‘‘কলকাতায় রাস্তার কুকুরদের উপর নিষ্ঠুরভাবে অত্যাচারের বিভিন্ন ঘটনা সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে৷ শুধুমাত্র একটি কুকুর, তাও আবার রাস্তার! এই ধরনের মনোভাবের জেরে কেউ কিছু বলছেন না৷ এমনকী পুলিশও কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করতে চাইছে না৷ এই ধরনের ঘটনায় আইন অনুযায়ী পুলিশ যদি ব্যবস্থা গ্রহণ না করে, তা হলে যাঁরা রাস্তার কুকুরের উপর নিষ্ঠুরভাবে অত্যাচার করছেন, তাঁরা ভয় পাবেন না৷’’

তবে, শেষ পর্যন্ত পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে৷ যে কারণে, সারমেয় তথা পশুপ্রেমী বিভিন্ন সংগঠনের তরফে এমন স্বস্তিও প্রকাশ করা হচ্ছে যে, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে, কোনও পশু এমনকী রাস্তার কোনও সারমেয় অথবা মার্জারের উপরেও অত্যাচার করতে কোনও মানুষ দু’বার হলেও ভাববেন৷

======================================================

রাস্তার সারমেয় সংক্রান্ত আরও খবর:

(০১) মানব ধর্ষণের শিকার রাস্তার প্রসূতি-সারমেয়

(০২) মিশন: কেরল বয়কটের ভরসা এখন বেঙ্গালুরু

(০৩) মানুষের খাদ্য হিসেবে নিখোঁজ হচ্ছে রাস্তার সারমেয়রা!

(০৪) রাস্তার সারমেয়দের হত্যায় অনশন-বয়কট মিশন

======================================================