সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : এ এক অন্য ‘আতঙ্কবাদীর’ গল্প। পুলিশের খাতায় তিনি ছিলেন ‘terrorist’, বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ। তিনিই আবার বিজ্ঞানের একনিষ্ঠ ছাত্রী। রূপে ‘মোহিত’ হয়ে গিয়েছিল পুলিশরা। তিনি কল্পনা দত্ত। আজ আতঙ্কবাদ, আতঙ্কবাদী নিয়ে দেশ জুড়ে এক অন্যরকম পরিস্থিতি চলছে। এই ভারতীয় মহীয়সী বিপ্লবী নারীর রূপ গুণে আতঙ্ক ছড়িয়েছিল ব্রিটিশদের মাঝে। তিনি কল্পনা দত্ত।

‘ডন কো পকড় না মুশকিল হি নেহি, না মুমকিন হ্যাঁয়’। এই ফিল্মি ডায়লগের সঙ্গে অনেকটাই মিল রয়েছে কল্পনা দত্তের। যতবার পুলিশ তাঁকে ধরার চেষ্টা করেছে ততবার ব্যর্থ হয়েছে। আবার যখন ধরা পড়েছেন তখন প্রমানের অভাবে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে তাঁকে। তৎকালীন এক ইংরেজ পুলিশ অফিসার কল্পনার ছবি দেখে বলেই ছিলেন , “ডিসগাস্টিং, দিস বিউটিফুল লেডি ইস আ টেররিস্ট! আই ডোন্ট বিলিভ। ইউ অল আর ননসেন্স।” ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় চট্টগ্রামের পুলিশ তন্ন তন্ন করে খুঁজছিল কল্পনাকে কিন্তু ঠিক কোনওভাবে বেড়িয়ে যেতেন তিনি। চালিয়ে যেতেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন। প্রথম যখন কল্পনাকে নিয়ে কেস হিস্ট্রি সাজাতে বসে ব্রিটিশরা তখন ব্রিটিশ যুগের অ্যান্টি টেররিস্ট শাখার অফিসার ডিউক বলেছিলেন, “কেস হিস্ট্রি নেই, কারন কোন অপরাধ প্রমান হয়নি।”

ক্ষুদিরামের শহীদ হওয়ার কাহিনী,কানাইলাল দত্তের বীরগাথা অনুপ্রানিত করেছিল কল্পনাকে। চট্টগ্রামের বাড়িতে থাকতেই দেশপ্রেমের আদর্শের বীজ বপন হয়েছিল। কলকাতায় বেথুন কলেজে পড়ার সময় তা ক্রমে বাড়তে শুরু করেছিল। একদিকে বিজ্ঞান, অপরদিকে বিল্পব। দুয়ের জোড়া বিস্ফোরণ হয়েছিল ব্রিটিশদের উপর। ব্রিটিশদের কাছে সবরকম খবর ছিল কল্পনার বিষয়ে। তারা জানত মাস্টারদা সূর্য দেনের ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মির সদস্য কল্পনা। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন কেসে গ্রেফতার হওয়া রিপাবলিকান আর্মির সদস্য অনন্ত সিং,লোকনাথ বল,গণেশ ঘোষদের সঙ্গে একাধিকবার জেলে এসে সে দেখা করে যেত। কখনও কারও স্ত্রী সেজে, কখনওবা বোন হিসাবে। পুরুষ সেজেও জেলে এসে খবর দেওয়া নেওয়া করতেন। কিন্তু ব্রিটিশদের সুন্দরী ‘আতঙ্কবাদী’-র বিষয়ে সব জেনেও কিছুই টের পায়নি ব্রিটিশরা। কল্পনার বাড়ির বাইরে গুপ্তচর রেখেও কিচ্ছু করতে পারেনি পুলিশ। রাতবিরেতে কিছু অচেনা মানুষ আসত তাঁর বাড়িতে। কয়েকবার ফলো করে দেখেছিল চরেরা, কিন্তু কল্পনার নিখুঁত পরিকল্পনায় কোথায় মিলিয়ে যেত সন্দেহভাজনরা চরেরা বুঝতেই পারত না।

১৯৩১ সালের সেপ্টেম্বর মাস। চট্টগ্রামের আদালত চত্ত্বরে লোকনাথ বল, অনন্ত সিংদের আদালতে হাজিরা দেওয়ার কথা। পুলিশ কর্তাদের কাছে খবর ছিল হামলার ছক রয়েছে। দায়িত্বে কল্পনা। পুলিশ ভ্যান বেরোনোর ঠিক আগে ভিড়ের মাঝে দেখা গিয়েছিল বোরখা পরিহিত মুসলিম মহিলাকে। লম্বা চেহারা বিশেষ ভাবে নজর কেড়েছিল পুলিশের। মহিলা পুলিশ বাহিনী ঘিরে ফেলেছিল এলাকা। আদালতের গেটেও বাহিনী ছিল। কিন্তু উধাও হয়ে গিয়েছিলেন কল্পনা। এবারও ধোঁকা। মুসলিম নয় লাঠি হাতে বেড়িয়ে যাওয়া বৃদ্ধা ছিলেন কল্পনা। কিন্তু আদালত চত্ত্বর থেকে পাওয়া গিয়েছিল মারাত্মক বিস্ফোরক গান কটন। কার্পাস তুলোর ওপর নাইট্রিক অ্যাসিডের মিশ্রণ দিয়ে তৈরি এই গান কটন ডিনামাইটের মতো কাজ করতে সক্ষম ছিল। বিজ্ঞান এবং বিপ্লবের মিশ্রণ। প্ল্যান ছিল এই গান কটন দিয়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বন্দিদের মুক্ত করা। যে বিস্ফোরকের ভয়ে বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ থেকে শুরু করে ফরাসি সেনা কেঁপে যেতো, তা পোশাকের মধ্যে করে জেলে সরবরাহ করেছিলেন কল্পনা।

মাস্টারদার উদ্যোগে কল্পনা দত্ত ও প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার স্থান পেয়েছিলেন তাঁর বাহিনীতে। অদম্য সাহস,বন্দুক পিস্তলে নিখুঁত নিশানা। নতুন বিপ্লবীদের হাতে করে বিস্ফোরক তৈরি শেখাতেন কল্পনা। কল্পনা নয় বাস্তব।

১৯৩২ সাল। ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ করেন মাস্টারদা। আক্রমণের অন্যতম ‘মাস্টার মাইন্ড’ ছিলেন কল্পনা। দায়িত্ব ছিল ছদ্মবেশে ক্লাবে গিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ঢোকা বেরনোর পথ দেখে আসা। পুরুষের ছদ্মবেশে ক্লাবে ঢুকতে গিয়ে ধরা পড়ে গিয়েছিলেন। অনাহুত হিসাবে পুলিশ গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। কথা বের করার জন্য অকথ্য অত্যাচার থেকে শুরু করে মহিলা পুলিশ দিয়ে দৈহিক নির্যাতন কিচ্ছু বাদ যায়নি। একটি কথাও বেরোয়নি কল্পনার মুখ থেকে। টানা ২ মাসের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে পুলিশ তাঁকে ফের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল।

১৯৩৩ এর ১৬ ফেব্রুয়ারি গইরালা গ্রামে মাস্টারদার দলের নতুন বৈপ্লবিক পরিকল্পনার সময়ে পুলিশ ঘিরে ফেলেছিল পুরো দলটাকে। শুরু হয়েছিল গুলির লড়াই। কল্পনার সামনে এসে গুলি বৃষ্টিতে দিশেহারা হয়ে গিয়েছিল ব্রিটিশ পুলিশ। আবারও পালিয়ে যান কল্পনা। ধরা পড়ে গিয়েছিলেন মাস্টারদা। তাঁর গ্রেফতারির পর অনেক পালিয়ে পালিয়ে বেড়িয়ে শেষ পর্যন্ত কল্পনাসহ গোটা দল ধরা পড়ে পুলিশের হাতে।

চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন, ষড়যন্ত্র, বিস্ফোরক, হত্যা নানা অপরাধে সূর্য সেন ও তারকেশ্বর দস্তিদারের ফাঁসির আদেশ হয়। মহিলা এবং বয়স কম। সম্ভবত সেই কারনেই কল্পনার ফাঁসি হয়নি। বিচারে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। জেলে বসেই শুনেছিলেন মাস্টারদার ফাঁসির খবর। ১৯৩৯ সালে ছাড়া পান তিনি। ব্রিটিশমুক্ত ভারতের স্বপ্ন দেখার পাশাপাশি কল্পনা চেয়েছিলেন দারিদ্রমুক্ত,শোষণমুক্ত ভারতকে দেখতে। জেল থেকে বেরিয়ে তিনি কমিউনিস্ট আন্দোলনে যোগ দেন। গরীব প্রান্তিক মানুষদের জন্য কাজ করেছেন শেষ দিন পর্যন্ত। যুদ্ধ,দাঙ্গা,রোগ মহামারী, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত মানুষের পাশে ছুটে যেতেন বারবার। ১৯৯৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি পরলোক গমন করেন মহীয়সী কল্পনা।

তথ্যসূত্র : Nil Lohit‎

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ