দ্রৌপদী মহাকাব্যের কেন্দ্রীয় চরিত্র হলেও মহাভারতে অনেক নারীই আছেন যাঁদের সাহসীকতার কথা আলাদা করে বলার মতো৷এঁদের মধ্যে অন্যতম নারী হলেন হলেন সত্যবতী। সত্যবতীর গায়ে তীব্র মাছের গন্ধ থাকায় তাঁর আরেক নাম ‘মৎস্যগন্ধা’৷ এজন্য কেউ তার কাছে আসতে চাইত না। তাই পালকপিতা রাজা দেশ-এর নির্দেশে তিনি যমুনার বুকে নৌকা চালানো আর জেলেনির কাজ করতে থাকেন।

যমুনা নদীতে খেয়া পারাপার করত মৎস্যগন্ধা। একদিন মৎস্যগন্ধা যমুনায় নৌকো চালাচ্ছিল, এমন সময় পরাশর মুনি তীর্থপর্যটন করতে করতে সেখানে এলেন। পরাশর মুনি শক্তি ও অদৃশ্যত্নীর পুত্র। শক্তি বশিষ্ঠের ছেলে। পরাশর মুনির কোনও স্ত্রী ছিল না। আর তার ভিতরে ছিল অদ্ভুত এক অদৃশ্য শক্তি৷ সেই শক্তি তিনি পেয়েছিলেন পিতা-মাতার কাছ থেকে।

ঋষি পরাশর সত্যবতীর নৌকায় উঠে তাঁর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন। তিনি সত্যবতীর সঙ্গে মিলন প্রার্থনা করেন। পরাশর মুনি বলেন, “আমাদের বংশধর রেখেও যেতে চাই। যে আমার প্রজ্ঞার অধিকারী হবে, আর তোমার কাছ থেকে পাবে কর্মের উত্তরাধিকার। তুমি আমার কামনা পূর্ণ করো। এসো, আমরা মিলিত হই— পুত্রসন্তান উৎপাদন করি।”

কিন্তু যমুনায় উপরে দিনের আলোয় উন্মুক্ত নৌকোয় মিলনে রাজি হননি মৎস্যগন্ধা। সে বলল, “যমুনার দুই তীরে অসংখ্য মানুষ রয়েছে, তারা আমাদের মিলন দেখতে পাবেন। আমি চাই না, এই ভাবে লোকচক্ষুর সম্মুখে আমরা সঙ্গমে লিপ্ত হই।” পরাশর মুনি মৎস্যগন্ধার কথা বুঝতে পেরে প্রজ্ঞাবলে এমন এক কুয়াশার সৃষ্টি করলেন, যার ফলে চারদিক তমসাচ্ছন্ন হল। পরাশর তারপর বললেন, “এবার এসো সুন্দরী, কেউ দেখতে পাবে না।” মৎস্যগন্ধা তবুও সম্মত হল না। সে বলল, “ঋষি, আমি কুমারী। আমার এই কৌমার্য কোনও ভাবেই আমি নষ্ট হতে দিতে চাই না। তা ছাড়া আমার জনক ধীবরই আমার প্রকৃত অভিভাবক। কুমারীত্ব হারালে তিনি আমাকে তাড়িয়ে দেবেন। কোন লজ্জায় কুমারীত্ব হারিয়ে গর্ভবতী হয়ে তার কাছে ফিরব আমি। আমার এই কন্যাভাব দূষিত করবেন না মুনিবর।”

প্রজ্ঞাবান পরাশর জবাব দিলেন, “তুমি আমার সঙ্গে যৌনমিলনেও কুমারীই থাকবে। তোমার গর্ভজাত সন্তানও সঙ্গে সঙ্গেই ভূমিষ্ঠ হবে। গর্ভধারণের বোঝা তোমাকে বইতে হবে না। আর সেই পুত্র আমার কাছেই থাকবে।” সেই খোলা আকাশের নীচে, কুয়াশাচ্ছন্ন যমুনা নদীর উপরে উন্মুক্ত নৌকায় পরাশর-মৎস্যগন্ধার মিলন হল। মৎস্যগন্ধার দেহ হয়ে ওঠে সুগন্ধময়। এক যোজন দূর থেকে তাঁর সুগন্ধ পাওয়া যেত বলে লোকে তার নাম দিল যোজনগন্ধা।

পরাশর-সত্যবতীর পুত্রের নাম হল কৃষ্ণদ্বৈপায়ন’। তার কোনও শৈশব ছিল না। জন্মেই সে কিশোরত্ব লাভ করে। সত্যবতী পিতার ঘরে ফিরে যায়। দ্বৈপায়ন ব্যাস চলে যায় পরাশর মুনির সঙ্গে, অনন্ত প্রজ্ঞক পাঠক্রম নিতে।

দেবী ভাগবত পুরাণে বলা হয়েছে, প্রথম দিকে পরাশর মুনির সঙ্গে মিলনে মৎস্যগন্ধার কোনও রকম ইচ্ছাই ছিল না। কিন্তু পরাশর তাঁকে প্রলোভন দেয় যে সে তাঁর গায়ের মাছের গন্ধ দূর করে সুগন্ধময় করে তুলবেন। এমনকী সে তার মিলিত হলে তাঁর কুমারীত্বও বিসর্জন দিতে হবে না। মূলত এই দুটি প্রলোভনেই মিলনে রাজি হয় মৎস্যগন্ধা৷