সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা : বন্যদের বনমহোৎসব পেরিয়েছে আগস্ট মাসে। সভ্যদের দুগ্গা পুজোও মহানন্দে কেটেছে। মাঝে আরও কয়েকবার বাঘ আতঙ্কে ছড়িয়েছে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে। কিন্তু কিনারা হয়নি মেদিনীপুরের বাঘ হত্যার।

প্রায় এক মাস ধরে বাঘ আতঙ্কে কেঁপেছে মেদিনীপুরের লালগড়ের বিভিন্ন অঞ্চলে। শেষ পর্যন্ত বাঘ হাতে আসেনি বন দফতরের। মারা পড়ে গ্রামবাসীদের হাতে। ১৩ এপ্রিল, ২০১৮ ঘটে সেই মর্মান্তিক ঘটনা। পূর্নবয়স্ক বাঘের দেহ নিয়েই বন থেকে ফিরতে হয় বনকর্মীদের। সাত মাস পেরিয়েও সেই বাঘ হত্যার কোনও কিনারা হল না। ঘটনার পর বনদফতর বাবলু ও বাদল হাঁসদা নামে দুই ব্যক্তিকে আটক করে। কারণ এরাই সকালে কয়েক বাঘের কাছাকাছি চলে এসেছিল ছিল বলে অনুমান করেছিল বনদফতর। প্রান বাঁচাতে বাঘটি দুজনকে আক্রমণ করে। নখের আঁচড়ে আহত বাবালু ও বাদল। এরপরেও দু সন্দেহভাজনকে আটক করার পরের দিনেই ছেরে দেওয়া হয়।

ফাইল ছবি

মুখ্য বনপাল রবিকান্ত সিনহা বলেন, “ওদেরকে আমরা সন্দেহভাজন হিসাবে আটক করেছিলাম। কিন্তু গ্রেফতার তো আমরা করতে পারি না। সেটা পুলিশের দায়িত্ব। ওদের দুজনকেই পুলিশ আটক করার পরের দিনেই ছেড়ে দিয়েছিল।”

এই মুহূর্তে তদন্তের গতি কি? রবিকান্ত সিনহা বলেন, “এখনও পর্যন্ত কোনও খবর আমাদের দেয়নি। কিছু জানি না কতদূর এগিয়েছে তদন্ত বা কিভাবে তদন্ত চালানো হচ্ছে।” বনদফতর কোনও তারা দিচ্ছে না? মুখ্য বনপালের কথায়, “আমরা তো আমাদের কাজ করেছি। তদন্ত করবে ওরা। এখানে আমরা কিছু বলতে পারি না।”

মহারাষ্ট্রে অবনী মৃত্যুর কিনারা হয়নি। তা নিয়ে দেশ জুড়ে হইচই হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, কেন্দ্র থেকে রাজ্য, বনপ্রাণী হত্যায় প্রশাসনের কবে ঘুম ভাঙবে?

১৩ এপ্রিল, বেলা ১ টা নাগাদ লালগড়ের বাঘঘরায় গভীর জঙ্গলে বাঘটিকে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয়রা। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি ছিল, জঙ্গলের একদল শিকারির সম্মিলিত নিষ্ঠুর প্রচেষ্টার শিকার করা হয় বাঘটিকে।ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পশুপ্রেমীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ফেসবুকে এই ঘটনার প্রতিবাদে ঝড় ওঠে। পশুপ্রেমীদের দাবি ছিল “বন্ধ হোক এই নিষ্ঠুর হত্যা।” প্রশ্ন উঠেছিল বাঘ ধরা নিয়ে বন দফতরের প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিয়ে।

ওইদিন সকাল থেকেই এই জঙ্গলে বাঘের উপস্থিতির অনেক প্রমাণ মেলে। বাঘটি আগের দিন রাতে প্রায় এক কুইন্টাল মতো বুনো-শূকরের ৪০ শতাংশ (৪০ কেজি) খেয়ে পাশের জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছিল। পায়ের ছাপও দেখা গিয়েছিল কাছাকাছি। বাঘের মৃত্যুর পর ময়নাতদন্ত করা হয়েছিল। সেখানে দেখা গিয়েছিল, বাঘের মাথায় ভারী কিছু দিয়ে আঘাতের ফলেই বাঘের খুলি ফেটে চৌচির হয়ে যায়। তারপর মৃত্যু নিশ্চিত করতে তাকে ঘিরে ধরে খুঁচিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে ময়নাতদন্তে। জোরদার প্রশ্ন উঠতে শুরু করে বনকর্মীদের ভূমিকা নিয়ে।

সবমিলিয়ে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল, শিকারিরা নিশ্চিত ছিল ওই এলাকায় বাঘ ছিল। তারপরেও বনকর্মীরা কেন খবর পেলেন না? তাছাড়া বাঘ আছে জেনেও কারা জঙ্গলে শিকারে যাচ্ছে তার খোঁজ কেন তাঁরা রাখলেন না? তাছাড়া যেভাবে বাঘটিকে হত্যা করা হয়েছে তাতে বিস্তর সময় লাগার কথা। কোথায় ছিলেন বনকর্মীরা? উঠেছে একাধিক প্রশ্ন। যে কায়দায় বাঘটিকে মারা হয়েছে তাতে পেশাদারিত্বের ছাপ স্পষ্ট ছিল। বাঘ কাণ্ড নিয়ে এমন প্রচুর রহস্যের উত্তর সাত মাস আগেও মেলেনি এখনও সেই উত্তর অমিল। রয়েছে যেন শুধুই গোঁজামিল দেওয়ার চেষ্টা।