স্টাফ রিপোর্টার, বর্ধমান : রাজ্যের প্রায় হারিয়ে যাওয়া শিল্পকে চাঙ্গা করতে উদ্যোগী রাজ্য সরকার৷ সেই লক্ষ্যেই শিল্প দফতর জোরদারভাবে কাজ শুরু করেছে পূর্ব বর্ধমান জেলায়। বর্ধমানের সেহারাবাজার এলাকায় জরি ও জারদৌসি ক্লাস্টারের প্রশিক্ষণ শুরু হল।

পূর্ব বর্ধমানের জেলা শিল্প কেন্দ্রের জেনারেল ম্যানেজার অভিজিৎ কর জানিয়েছেন, এব্যাপারে গত বছর কিছুটা কাজ হয়েছিল। এবছর কিছু টাকা এসেছে মার্কেট লিংকেজ, আপগ্রেডেশন ট্রেনিং-এর জন্য। সেই কাজ শুরু হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, শিল্পীদের রপ্তানি করার মত প্রোডাক্ট তৈরী করার জন্য তাঁরা লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দিয়েছেন। শিল্পীরাও তাতে উৎসাহ দেখিয়েছেন।

তিনি জানিয়েছেন, সেহারাবাজার এলাকায় প্রায় ৩০০ জনেরও বেশি শিল্পী কাজ করেন। এব্যাপারে একই ধরণের অনেকগুলি ইউনিট তৈরী করা হচ্ছে। এব্যাপারে খরচের ৯০ শতাংশ দিচ্ছে সরকার। বাকি ১০ শতাংশ উপভোক্তাকে দিতে হচ্ছে। অনেকক্ষেত্রে এই ১০ শতাংশতেও রাজ্য সরকার সহযোগিতা করছে।

পূর্ব বর্ধমান জেলায় প্রধানত ৪ টে ক্লাস্টারের সার্বিক উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অভিজিতবাবু জানিয়েছেন, কেতুগ্রাম ২-এর চরসুজাপুর-এ আখেরগুড় তৈরী হয়। কিন্তু এই শিল্পে যুক্ত যাঁরা তাঁরা সেভাবে লাভ দেখতে পাচ্ছেন না। এই দপ্তরের পক্ষ থেকে সেখানে বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

তিনি জানিয়েছেন, ওখানে যে আখ চাষ হয়েছে তা থেকে ৭ শতাংশ রস নিষ্কাশন হয়। ওটা ১৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ান যাবে। তারও প্রশিক্ষণ হচ্ছে। পাশাপাশি প্যাকেজিং-সহ সমস্ত বিষয়েয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ওখানে ২৫ টা ইউনিট কাজ করছে। এছাড়াও পূর্বস্থলী ১ ব্লকে মেশিনের মাধ্যমে শাড়ীতে এমব্রয়ডারীর কাজ হয়। সেখানে এই শিল্পকে নিয়ে ক্লাস্টার করা হয়েছে।

পূর্বস্থলী ২-এ ভেড়ার লোম বা পশম দিয়ে র‍্যাপার তৈরীর ক্লাস্টার তৈরী হয়েছে। এই শিল্পটি ওই এলাকা থেকে হারিয়ে যেতে বসেছিল। শ্রীরামপুর থেকে ডিজাইনার এনে এই শিল্পকে বাঁচানোর চেষ্টা চলছে। এই চারটি ছাড়াও পূর্বস্থলীতে দু চাকার যানের মেরামতির প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে,বর্ধমানে বিউটিশিয়ানের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

জানা গিয়েছে, ৩৬ ইউনিটে ডিজাইন ডেভলপমেন্ট ট্রেনিং চালু হয়েছে। ৫০০-এর উপর মানুষ এখানে কাজ করছেন। জরি ও জারদৌসি-এর এই প্রকল্পটির মোট খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ৫ কোটি টাকা। ইন্ডাস্ট্রিয়াল কোঅপারেটিভ গড়ে দিয়ে কাজ হচ্ছে।

তিনি জানিয়েছেন, এরই পাশাপাশি এই জেলার রাইসমিল ক্ল্যাস্টার ১৬ কোটি টাকার একটি প্রকল্প জমা দিয়েছে। দিল্লী থেকে অনুমোদনের পথে রয়েছে। ধানকলগুলি রাইস ব্রাণ্ড বিক্রি করে দেয়। সেগুলি অন্যরা কিনে তেল তৈরী করে। এই প্রকল্প অনুমোদিত হলে রাইসমিল ক্ল্যাস্টার-এ ওরা ইউনিট তৈরী করে নিজেরাই তেল তৈরী করতে পারবেন।

তিনি জানিয়েছেন, বর্ধমানের বিখ্যাত সীতাভোগ-মিহিদানা রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্যাকেজিং-পিজারভেশন নিয়ে কিছু সমস্যা রয়েছে। রাজ্য দফতরের মাধ্যমে মহীশূরে পরীক্ষার জন্য পাঠান হয়েছে। সেখান থেকে রিপোর্ট আসা এবং সবুজ সংকেত মিললে রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া হবে।

তিনি জানিয়েছেন, এছাড়াও বর্ধমান জেলা থেকে ড্রাই অয়েল ব্রাণ্ড, ডোকরা,মাছের আঁশ দিয়ে তৈরী পণ্য, খন্ডঘোষের ফেজটুপি নিয়েও ক্ল্যাস্টার তৈরী করে কাজ করা হবে। প্রসঙ্গত, জেলা শিল্প কেন্দ্রের আধিকারিক মৌমিতা চৌধুরী জানিয়েছেন, সেহারাবাজারের জরি ও জারদৌসির জন্য এই এলাকায় ৩৬ জন স্টেকহোল্ডার আছে যারা কোঅপারেটিভ তৈরী করেছেন। সেগুলি নিয়ে একটা ক্ল্যাস্টার তৈরী হয়েছে।

অন্যদিকে, সেহারাবাজার জরি এণ্ড জারদৌসি প্রোডাক্ট ম্যানুফাকচারিং ইণ্ড্রাষ্ট্রিয়াল ক্লাষ্টার সোসাইটি লিমিটেডের সম্পাদক রামপ্রসাদ পরামাণিক জানিয়েছেন, এই এলাকায় ৩০-৪০টি ইউনিট তৈরী হয়েছে। প্রতিটা ইউনিটে ৫ থেকে ২০ জন কাজ করেন। সেহারা গ্রাম পঞ্চায়েতে ৬০০-৭০০ শিল্পী রয়েছেন। ৩০-৪০ টা ইউনিট নিয়ে ক্ল্যাস্টার তৈরী হয়েছে। এখন মোট ৬০ টা ইউনিট।

তিনি জানিয়েছেন, শাড়ী, চুড়িদার, লেহেঙ্গা প্রভৃতি প্রায় প্রতি মাসে ৭ হাজার পিসের কাজ হয়। গড় আয় হচ্ছে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা প্রতি মাসে। তিনি জানিয়েছেন, এই কাজ যদি মেশিনে করা যায় তাহলে দ্বিগুনের বেশি কাজ হবে। তিনি জানিয়েছেন এই কাজে পুরুষ, মহিলা, বৃদ্ধ এমনকি শিশুরাও কাজ করে। রাজ্যের পাশাপাশি সুরাট, বোম্বে থেকেও কাজের বরাত আসছে।