বিশ্বজিৎ ঘোষ, কলকাতা: প্রথমে চিকিৎসায় অবহেলা৷ আর, তার পর, হাসপাতালেই সংক্রমণের শিকার এবং দিনের পর দিন ভেন্টিলেশনে৷ শেষ পর্যন্ত, মৃত্যুর দায় এড়ানোর জন্য পরিজনদের অনুপস্থিতিতে, বকেয়া ১৭ লক্ষ ১১ হাজার টাকা না নিয়েই ভেন্টিলেশন থেকে ওই রোগীকে এসএসকেএম হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিল দক্ষিণ কলকাতার বেসরকারি এক হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ৷

অথচ, টাকা না দিলে এক সময় ওই রোগীর চিকিৎসা এবং পথ্য বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল এই হাসপাতাল থেকেই৷ অভিযোগ এমনই৷ শুধুমাত্র তাই নয়৷ পরিজনদের সম্মতি না নিয়ে ওই রোগীকে ভেন্টিলেশনে দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ৷ এ দিকে, এসএসকেএম হাসপাতালে ওই রোগীকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি৷ কিন্তু, আড়াই বছর পেরিয়ে গেলেও, বকেয়া টাকার জন্যই এখনও পর্যন্ত পরিজনদের হাতে ওই রোগীর মেডিক্যাল রেকর্ডস দেয়নি বেসরকারি ওই হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ৷ যদিও, আইন অনুযায়ী, চিকিৎসার খরচ হিসাবে টাকা বকেয়া থাকলেও কোনও রোগীর মেডিক্যাল রেকর্ডস আটকে রাখা যায় না৷

এই ঘটনায় বিচার প্রার্থনা করে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থানে অভিযোগ জানিয়েছেন পরিজনরা৷ এবং, গোটা বিষয়টি উল্লেখ করে ৮০ লক্ষ টাকা আর্থিক ক্ষতিপূরণের জন্য আবেদন জানানো হয়েছিল রাজ্যের কনজিউমার ডিসপিউটস রিড্রেসাল কমিশনে৷ শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ কলকাতার ওই বেসরকারি হাসপাতালের কর্তৃপক্ষকে নোটিশ পাঠাল কমিশন৷ ৭৬ বছর বয়সি মৃত ওই রোগীর নাম বীরেন্দ্র দত্ত৷ তিনি বীরভূমের লাভপুরের বাসিন্দা ছিলেন৷ তাঁর ছেলে টুটুল দত্তর কথায়, ‘‘লাভপুর গ্রামীণ হাসপাতাল থেকে বাবাকে সিউরি সদর হাসপাতালে রেফার করা হয়েছিল৷ সেখান থেকে কলকাতায় রেফার করা হয়৷ বাবার স্ট্রোক হয়েছিল৷ আমরা মনে করেছিলাম, উডল্যান্ডস হাসপাতালে নিয়ে গেলে বাবাকে বাঁচাতে পারব৷’’

একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘কিন্তু, ভুল চিকিৎসার জন্য এই হাসপাতালে ভর্তি করানোর পাঁচ দিন পরে বাবাকে ভেন্টিলেশনে দেওয়া হয়৷ ভেন্টিলেশনে দেওয়ার জন্য আমাদের সঙ্গে কথাও বলেনি৷’’ শুধুমাত্র তাই নয়৷ টুটুল দত্ত বলেন, ‘‘হাসপাতালে আমরা বার বার বলেছিলাম, ডাক্তার বদলে দেওয়া হোক, তা হলে বাবাকে বাঁচানো যাবে৷ অথচ, আমাদের আবেদন শোনা হয়নি৷ হাসপাতালে বাবা সংক্রমণের শিকার হয়ে পড়েন৷’’ উচ্চ রক্তচাপ এবং মাথায় যন্ত্রণার সমস্যা নিয়ে বীরেন্দ্র দত্তকে ২০১৪-র নয় ডিসেম্বর দক্ষিণ কলকাতার বেসরকারি ওই হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছিল৷ আর, বেসরকারি ওই হাসপাতাল থেকে এসএসকেএম হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছিল ২০১৫-র নয় মার্চ৷ সেখানে ২০১৫-র ছয় এপ্রিল এই রোগীর মৃত্যু হয়৷ তবে, দক্ষিণ কলকাতার বেসরকারি ওই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে৷

টুটুল দত্তর কথায়, ‘‘উডল্যান্ডস হাসপাতালে দুই দফায় বাবাকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছিল৷ কিন্তু, শেষের দিকে বার বার আমাদের বলা হয়, আমরা যেন বাবাকে এসএসকেএম হাসপাতালে নিয়ে যায়৷ এসএসকেএম হাসপাতালে বাবাকে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার কথাও বলা হয়৷ এমনও বলা হয়, হাসপাতাল তখন যে টাকা পাবে, সেই টাকা তখন না দিয়ে আমরা যেন বাবাকে এসএসকেএম হাসপাতালে নিয়ে যায়৷’’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘আমরা নিয়ে যায়নি৷ তবে, এটা বলেছিলাম, দিল্লির এইমস অথবা বেঙ্গালুরুর হাসপাতালে বাবাকে রেফার করা হোক, তা হলে আমরা নিয়ে যাব৷ কিন্তু, এই দুই হাসপাতালের কোথাও বাবাকে উডল্যান্ডস হাসপাতাল থেকে রেফার করতে চাওয়া হয়নি৷’’ এখানেও শেষ নয়৷

টুটুল দত্ত বলেন, ‘‘একদিন আমাদের অনুপস্থিতিতে বাবাকে এসএসকেএম হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয়৷ আমরা জানতাম না৷ তাই, উডল্যান্ডস হাসপাতালে বাবাকে না পেয়ে পুলিশে আমরা অভিযোগ জানিয়েছিলাম৷ তবে, বাবাকে বাঁচানো গেল না৷ এসএসকেএম হাসপাতাল থেকে বলা হয়েছিল, উডল্যান্ডস হাসপাতালে যে অবস্থা হয়ে গিয়েছে, তাতে বাবাকে আর বাঁচানো সম্ভব না৷’’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘বাবাকে বাঁচানোর আশা নিয়েই উডল্যান্ডস হাসপাতালে গিয়েছিলাম৷ কিন্তু, এই হাসপাতালের ভুল চিকিৎসার জন্য বাবার মৃত্যু হল৷’’ শুধুমাত্র তাই নয়৷ তিনি বলেন, ‘‘সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ রয়েছে, ভেন্টিলেশন থেকে রোগীকে অন্য হাসপাতালে পাঠানো যায় না৷ উডল্যান্ডস হাসপাতালে যাতে বাবার মৃত্যু না হয়, এই দায় যাতে এড়িয়ে যাওয়া যায়, তার জন্যই এসএসকেএম হাসপাতালে বাবাকে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয়েছিল৷’’

এই ঘটনায় মৃত রোগীর পরিজনরা যাতে বিচার পান, তার জন্য সহায়তা করছে পিপল ফর বেটার ট্রিটমেন্ট (পিবিটি)৷ অনাবাসী ভারতীয় ডাক্তার তথা পিবিটির প্রেসিডেন্ট, কুণাল সাহার কথায়, ‘‘আমাদের মনে হচ্ছে, মেডিক্যাল রেকর্ডস দিয়ে দিলে বীরেন্দ্র দত্তর চিকিৎসায় অবহেলার বিষয়টি প্রমাণিত হয়ে যাবে৷ সেই জন্য মেডিক্যাল রেকর্ডস দেওয়া হয়নি৷’’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘টুটুল দত্তকে পাঠানো ২০১৫-র আট জুনের এক চিঠিতে উডল্যান্ডস হাসপাতাল বলেছে, বকেয়া টাকা দিয়ে দিলে মেডিক্যাল রেকর্ডস দিয়ে দেওয়া হবে৷

কিন্তু, এমসিআই কোড অফ মেডিক্যাল এথিকস অ্যান্ড রেগুলেশনস, ২০০২ অনুযায়ী, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে মেডিক্যাল রেকর্ডস দিয়ে দিতে বাধ্য বেসরকারি এই হাসপাতাল৷’’ কমিশনের নোটিশ এবং মৃত রোগীর পরিজনদের অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চেয়ে বেসরকারি ওই হাসপাতালের সিওও সুপর্ণা সেনগুপ্তর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়৷ তবে, তিনি ফোন কল না ধরায় কোনও বক্তব্য মেলেনি৷

লাল-নীল-গেরুয়া...! 'রঙ' ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা 'খাচ্ছে'? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম 'সংবাদ'! 'ব্রেকিং' আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের। কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে 'রঙ' লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে 'ফেক' তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই 'ফ্রি' নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.