সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়: রাম নামে মগ্ন দেশের রাজনীতি। আবার সামনেই রামনবমী, উৎসবের মেজাজে দেশের রাম ভক্তরা। পশ্চিমবঙ্গ থেকে উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বেরোবে রাম নবমীর মিছিল। কিন্তু যে দেশ ভগবান রামের নয়, নয় তাঁর স্ত্রী সীতারও সেই দেশ অর্থাৎ শ্রীলঙ্কা জুড়েই ছড়িয়ে রয়েছে তাঁদের অজস্র ‘স্মৃতি’। রামায়ণের কাহিনীকে তা যেন সত্যের রূপ দেয়।

সীতা কোঠুয়া – রামায়ণ অনুযায়ী লঙ্কা ছিল রাবণের রাজধানী। এখানেই রাণী মন্দোদরীর প্রাসাদ ছিল। সীতাকে অপরহণ করে এনে এখানেই নজরবন্দি করে রেখেছিলেন রাবণ। পরে তাঁকে অশোক বাটিকাতে নিয়ে যাওয়া হয়। সীতা ছিলেন বলে জায়গাটির নাম হয়েছে সীতা কোঠুয়া। এখন তা শ্রীলঙ্কার দর্শনীয় স্থল।

 

 

রথের পথ ও সীতার অশ্রুকুণ্ড – সীতা কোঠুয়া থেকে এই পথ ধরেই লঙ্কেশ্বর অশোক বাটিকায় নিয়ে গিয়েছিলেন সীতাকে। রাবণের রথের চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘাস শুকিয়ে মরে গিয়েছিল বলে কথিত রয়েছে। তাই আজও ওই পথে কোনও ঘাস গজায় না। আশ্চর্যের ব্যাপার হল, আশপাশ কিন্তু ঘন জঙ্গলে আর ঘাসে ঢাকা। পথের এক ধারে
রয়েছে সীতার অশ্রুকুণ্ড। সীতার চোখের জলে এই কুণ্ড সৃষ্টি হয়েছিল বলে জনশ্রুতি।

অশোক বাটিকা ও সীতা এলিয়া – যে গাছের নীচে বসে সীতা রামের জন্য অপেক্ষা করতেন, সেটি আজ হয়তো আর বেঁচে নেই বা তা আদৌ ছিল কি না তা নিয়ে আজও ভারতে বহু তর্ক কিন্তু যা এখনও বর্তমান তা হল অশোক বন বা অশোক বাটিকা। এখানে বন্দিনী থাকার সময় পার্শ্ববর্তী একটি ঝর্ণায় সীতা স্নান করতেন। সেখানেই আজ রয়েছে সীতাআম্মান মন্দির। জায়গাটিকে লোকে সীতা এলিয়া বলেও চেনে। সীতার পুজো হয় এখানে।

উষণগোডা – আদতে এটি একটি লালমাটির বিশাল মাঠ। কথিত রয়েছে, এখানে এক সময় রাবণের প্রাসাদের অংশ ছিল। ছিল সুন্দর বাগান। হনুমানকে ধরে যখন ল্যাজে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়, তখন এই অংশটিই হনুমান পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছিলেন। তার পর অনেক বার চেষ্টা করা সত্ত্বেও এখানে কোনও ফসল ফলেনি।
তাই জায়গাটির নাম উষণগোডা।

রাবণ গুহা – জনশ্রুতি, রাবণ এই গুহাতেই তপস্যা করতেন। রামচন্দ্র যখন লঙ্কা আক্রমণ করেছেন, তখন সীতাকে কিছুদিন এই গুহায় লুকিয়ে রেখেছিলেন রাবণ। গুহা ছাড়াও এখানে রয়েছে একটি ঝর্ণা। চারপাশে ঘন জঙ্গল। রাবণ নাকি এখানে স্নান করতেন বলে কথিত আছে। গুহার ভিতড়ে আজও বর্তমান গা ছমছমে পরিবেশ।

কাতির্কমম – রাম-রাবণের যুদ্ধ তখন চলছে। যুদ্ধের শেষদিন দেবরাজ ইন্দ্র কার্তিককে ডেকে বললেন, রামের পক্ষে যুদ্ধে অংশ নিতে। এই জায়গাতেই কার্তিক রামের সামনে উদয় হন এবং বলেন তিনি যুদ্ধে সহায়তা করবেন। সেই ইতিহাস স্মরণ করেই তৈরি হয়েছে মন্দিরও। নিয়মিত ভক্তদের ঢল নামে। জায়গাটির অপর নাম কাতারাগামা

দুনুউইলা – একটি সাধারণ গ্রাম দুনুউইলা। রয়েছে একটি হ্রদ। কথিত রয়েছে , রাম-রাবণের শেষ যুদ্ধ এখানেই হয়েছিল। ব্রহ্মাস্ত্র দিয়ে রাবণের মাথা কেটে ফেলেছিলেন রাম। রাবণ মারা যাওয়ার পর তাঁর মুণ্ডহীন দেহ রাখা হয়ে পার্শ্ববর্তী শিলাখণ্ডের ওপর। সেখান থেকে রক্ত গড়িয়ে এসে লাল করে দিয়েছিল দুনুউইলা গ্রামের হ্রদের জলে।

দিবুরুমপোলা – বলা হয় এখানেই হয়েছিল সীতার অগ্নিপরীক্ষা। রাবণের সঙ্গে ভয়ঙ্কর যুদ্ধে জয়ী হয়ে স্ত্রী সীতাকে নিয়ে ফেরার পথে, তাঁকে তাঁর সতীত্ব প্রমাণ দিতে। চেয়েছিলেন অগ্নিপরীক্ষা। সীতা আগুনে ঝাঁপ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অগ্নিদেব এসে উদ্ধার করেছিলেন বলে জানা যায় মহাকাব্য থেকে। তিনি রামকে বলেছিলেন, সীতা নিষ্কলঙ্ক।

মুনীশ্বরম – মুনীশ্বরম একটি পুণ্যক্ষেত্র। লঙ্কা জয় করে অযোধ্যা ফেরার পথে রামের মনে হয়েছিল, রাবণের মতো একজন নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণকে হত্যা করে তিনি মহাপাপ করেছেন। এই জায়গাতেই তাই তিনি পাপস্খলনের উদ্দেশ্যে তপস্যা শুরু করেন। শেষে ভগবান শিব আবির্ভূত হন এবং বলেন, তাঁর দোষ খণ্ডন হয়েছে। আরও যে চারটি জায়গায় রয়েছে রাময়ণের স্মৃতি বহন করে সেগুলি হল রুমাশালা, রিতিগালা, থল্লাডি এবং কচ্ছাথিভু।