ডিগবাজির তালিকায় কি এবার বৈশালী ডালমিয়া বা প্রবীর ঘোষালের পরে শ্রীকান্ত মোহতাও? এই প্রশ্ন ওঠার কারণ রাজ্য রাজনীতিতে যখন উত্তেজনার পারদ তুঙ্গে, এবং অভিনেত্রীদের ওপর ‘আক্রমণ’-এর অভিযোগকে কেন্দ্র করে সংস্কৃতি জগতের অনেকেই রাস্তায় নেমেছেন, তখন টলিউডের এই হেভিওয়েট প্রযোজকের কোনও দেখা নেই!

বরং ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে নেতাজির স্মরণে যে অনুষ্ঠানে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান ওঠা নিয়ে এত বিতর্ক, সেখানে বিজেপির তরফে যেসব শিল্পীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, তাঁর মধ্যে বেঙ্কটেশ ফিল্মসের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত বেশ কয়েকজন তারকা ছিলেন।

লিখলেন– সুমন ভট্টাচার্য

টালিগঞ্জের সেই তরুণ অভিনেতা তো ছিলেনই, যিনি ডিগবাজি খাওয়াতে রুশ অলিম্পিয়ান সের্গেই বুবকার রেকর্ডও ভেঙে দেবেন, যিনি সিপিএমের একনিষ্ঠ সমর্থক থেকে তৃণমূলের আমলে সরকারি পদের সুযোগ সুবিধা ভোগ করার পরে এখন আবার ‘বিবেক’-এর ডাক শুনতে পাচ্ছেন!

শ্রীকান্ত মোহতার অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠার কারণ, অতীতে রাজ্যের শাসক দলের হয়ে সেলিব্রিটিদের যোগার করে এই সব ‘ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট’ তিনিই করতেন।

কিন্তু সায়নী ঘোষ বা দেবলীনা দত্ত সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রোলড হওয়ার পর ধর্মতলায় টলিউডের অনেক শিল্পী যে প্রতিবাদ সভায় যোগ দিয়েছিলেন, তার মূল উদ্যোক্তা ছিলেন পরিচালক রাজ চক্রবর্তী।

একদা শ্রীকান্তের ‘ঘনিষ্ঠ’ বৃত্তে থাকা, এখন তৃণমূলের সাংসদ নূসরত জাহানই বরং সেই মঞ্চ থেকে সবচেয়ে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়েছেন। বিজেপি-বিরোধী টলিউডের সমাবেশ থেকে দূরত্ব বাড়িয়ে এবং ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে তাঁর ‘বেতনভুক’-দের পাঠিয়ে শ্রীকান্ত মোহতা কি নতুন কোনও সমীকরণ তৈরি করতে চাইছেন?

এমনিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি কোনও ব্যালেন্সশিট নিয়ে বসেন, তাহলে নিশ্চয়ই তিনি বুঝতে পারবেন শ্রীকান্ত মোহতাই হোক, কিংবা অন্য ‘ডিগবাজি’-শ্রীরা তাঁর জন্য কতটা সম্পদ, আর কতটাই বা বোঝা ছিল। শাসক দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সূত্রে ভেঙ্কটেশ ফিল্মসের শ্রীকান্ত মোহতা যেমন একাধিক সরকারি সুযোগ সুবিধা পেয়েছেন, তেমনই আজকে ‘বেসুরো’ হয়ে যাওয়া অনেক অভিনেতাও সরকারি পদে থেকে মাসোয়ারা নিতেও দ্বিধা করেননি।

কিংবা ধরা যাক বৈশালী ডালমিয়ার কথা, একদা জ্যোতি বসুর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত জগমোহন ডালমিয়ার বানতলা লেদার কমপ্লেক্স বানানো নিয়ে বিবিধ অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু ঠিক সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আঁচল ধরে নিয়ে বৈশালী ডালমিয়ারা শুধু সেইসব অভিযোগের তদন্তকে এড়িয়ে যেতে পেরেছেন তাই নয়, ক্রিকেট অ্যাসেসিয়েশন অব বেঙ্গল বা সিএবি-কে পারিবারিক ‘জমিদারি’-তে পরিণত করেছিলেন।

বৈশালী ডালমিয়ার ‘বেসুর’ লক্ষ্য করছিলেন বলেই হয়তো বুদ্ধিমান তৃণমূল নেত্রী ক্রিকেট প্রশাসনে আর এক কুশলী, বিশ্বরূপ দে-কে গত সপ্তাহেই নিজের দলে টেনে নিয়েছেন। রাজনৈতিক দিক থেকে যাঁরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দীর্ঘদিন রয়েছেন, এমন অনেক নেতা-কর্মীই আক্ষেপ করে বলেন, তৃণমূল সুপ্রিমোর এই টলিউডের দিকে ঝোঁক দলে অনেক বেনোজল ঢুকিয়েছিল।

নির্বাচনের মুখে, বিজেপি যখন তৃণমূলের দিকে প্রবল চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে, তখন রাজ্যের শাসক দলের এই পুরনো নেতাদের বক্তব্য, রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায় হোক কিংবা প্রবীর ঘোষাল অথবা বৈশালী ডালমিয়া দলের দুর্দিনে কোনও কিছু না করেও পদ পেয়েছেন, ক্ষমতা ভোগ করেছেন।

কিন্তু যেই কঠিন পরিস্থিতিতে, ঘুর্নি পিচে ব্যাট করার সময় এল, তখন এঁদের স্বরূপ চেনা গেল। রাজ্যের এক মন্ত্রীর কথায়, ‘রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায় বা বৈশালী ডালমিয়া নিজেরা নির্দল হিসেবে নিজেদের বিধানসভা কেন্দ্রে কোনও দিন দাঁড়ানোর কথা ভেবেছেন? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এঁদের তুলে এনে জনপ্রতিনিধি করেছেন, ক্ষমতার অংশীদারিত্ব দিয়েছেন, আর তাঁরাই এখন তৃণমূল নেত্রীর পেছনে ছুরি মারছেন।’

শ্রীকান্ত মোহতার ডিগবাজি খাওয়ার সম্ভবনা বা হুগলিতে ‘বেসুরো’ বিধায়ক প্রবীর ঘোষালের সমর্থনে ‘দাদা’-র অনুগামী বলে পোষ্টার পরা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে রসিকতার অভাব নেই। মমতা ঘনিষ্ঠ এক নেতা বলছিলেন, ‘‘শুভেন্দু, রাজীব এবং তারপরে প্রবীর ঘোষাল… এই ‘দাদার অনুগামী’ শিরোনাম দিয়ে ফ্লেক্স দেওয়াটা এবার হাস্যকর হয়ে যাচ্ছে।

প্রবীর ঘোষালের এত অনুগামী আছে, সেটা বোধহয় তিনি এর আগে যখন সাংবাদিক ছিলেন, তখন তাঁর সংবাদপত্রের অফিসেও কেউ জানতেন না। যে বিজ্ঞাপন এজেন্সি তৃণমূল থেকে বিজেপিতে যেতে চাওয়া এই সব নেতাদের তুলে ধরতে ফ্লেক্স বানাচ্ছে, তাদের বোধহয় একটু গবেষণা করা উচিত।

সবার ক্ষেত্রেই যদি এত ‘দাদার অনুগামী’দের আবির্ভাব হয়, তাহলে বোধহয় দাদারাও একটু ঘাবড়ে যাবেন।” রাজীব-বৈশালী-প্রবীর এর মতো শ্রীকান্ত মোহতাও ‘ডিগবাজি’ দিলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বৃত্তটা সম্পূর্ণ হবে।

কারণ কোনও রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে এঁরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ বৃত্তে যাননি, আবার এখন যদি গেরুয়া শিবিরের ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করেন, সেটাও কোনও জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে নয়। শ্রীকান্ত মোহতরা আসলে সবসময়ই ক্ষমতার ঘনিষ্ঠ থাকতে চান।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে শুধু খেয়াল রাখতে হবে, প্রযোজক গেছে, অভিনেতা গেছে, ক্রিকেটারেরও অন্যদিকে নজর; কোন কবি এবার শ্যামাপ্রসাদের বন্দনায় কলম ধরবেন বা কোন শিল্পী ভারতমাতার ছবি আঁকাকেই জীবনের ব্রত করে নেবেন?

লাল-নীল-গেরুয়া...! 'রঙ' ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা 'খাচ্ছে'? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম 'সংবাদ'! 'ব্রেকিং' আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের। কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে 'রঙ' লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে 'ফেক' তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই 'ফ্রি' নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.

করোনা পরিস্থিতির জন্য থিয়েটার জগতের অবস্থা কঠিন। আগামীর জন্য পরিকল্পনাটাই বা কী? জানাবেন মাসুম রেজা ও তূর্ণা দাশ।