অভিষেক কোলে: এ এক নতুন চ্যালেঞ্জ৷ আইপিএলে নতুন ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে দলকে সাফল্যের ঠিকানা খুঁজে দেওয়ার চ্যালেঞ্জের থেকেও টুকরো ব্যক্তিগত আঙ্গিকে সৌরভের কাছে এটা ছিল যথার্থই প্রেসটিজ ফাইট বা সম্মান রক্ষার লড়াই৷ বলা বাহুল্য, সেই লড়াইয়ে সসম্মানে উতরে গেলেন মহারাজ৷

আইপিএলের ইতিহাসে দিল্লি ক্যাপিটালসের রেকর্ড মোটেও ভালো নয়৷ প্রতি মরশুমে দল নিয়ে বিস্তার পরীক্ষা নিরীক্ষা চালালেও সাফল্যের হদিশ পায়নি তারা৷ তবে কোনও পরিস্থিতিতেই তারুণ্যের জয়গান গাইতে পিছপা হয়নি দিল্লি৷ এবারও একঝাঁক তরুণ তুর্কিকে দিয়ে দলের মেরুদণ্ড শক্ত করেছে ক্যাপিটালস এবং নেতৃত্বের পাশাপাশি কোচিংয়েও চনমনে সব নতুন মুখের আমদানি করেছে তারা৷ যার নবতম সংযোজন মেন্টর সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়৷আরও পড়ুন: দাদা বনাম শাহরুখের আবহেই রবিবাসরীয় ইডেনে হলুদ ঝড়ের আভাস

বাংলা ক্রিকেটারদের টুকি টাকি পরামর্শ দেওয়া, অনুশীলনে হাজির থেকে মনোজ তিওয়ারিদের নির্দেশ দেওয়া, সিএবি সভাপতি হিসাবে এমন কাজ প্রায়শই করে থাকেন দাদা৷ তবে আইপিএলের মতো পেশাদার টুর্নামেন্টে পূর্ণ সময়ের মেন্টরের দায়িত্বে এই প্রথম দেখা গেল সৌরভকে৷ খেলা ছাড়ার পর ক্রিকেট প্রশাসক ও ধারাভাষ্যকার হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন প্রিন্স অফ ক্যালকাটা৷ এবার কোচিং স্টাফ হিসাবে নিজেতে তুলে ধরার চ্যালেঞ্জ তাঁর সামনে৷

সুতরাং আইপিএলের ইতিহাসে অন্যতম ধারাবাহিক ব্যর্থ দল দিল্লির মেন্টর হওয়াটা ছিল সৌরভের কাছে বড়সড় চ্যালেঞ্জ৷ তাতে বাড়তি মাত্রা যোগ করে নিজের আঁতুরঘর ইডেনে কলকাতা নাইট রাইডার্সের বিরুদ্ধে মহারাজের ব্যক্তিগত লড়াইয়ের প্রসঙ্গ৷ ইডেন যদি কেকেআরের দূর্গ হয়, তবে সৌরভেরও যে খাস তালুক, তা বলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই৷ ইডেনের প্রতিটা ঘাসকে তিনি চেনেন হাতের তালুর মতো৷ ছেলেবেলা থেকে যেখানে ক্রিকেট খেলে বড় হয়েছেন, খেলা ছাড়ার পর এখন তিনি সেই ইডেনের সর্বময় কর্তা৷ সেদিক থেকে ঘরের মাঠে প্রতিপক্ষ নাইটদের টেক্কা দেওয়াটা তাঁর কাছে নিশ্চিতভাবেই প্রেসটিজ ফাইট হয়ে দাঁড়িয়েছিল৷ শিখর ধাওয়ান, ঋষভ পন্তদের সৌজন্য সেই সম্মান রক্ষার লড়াইয়ে ফুল মার্কস পেয়ে গেলেন দাদা৷

আরও পড়ুন: ধাওয়ানের ব্যাটে ইডেনে ‘নাইট বধ’ সৌরভের দিল্লির

আসলে বাংলার ক্রিকেটমহল এই ম্যাচটাকে বদলার লড়াই হিসাবেই চিহ্নিত করে আসছিল সৌরভ দিল্লির দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে৷ একদা কেকেআরে বঞ্চনার শিকার হওয়া সৌরভ আসলে বাংলার ক্রিকেটপ্রেমীদের জবাব দেওয়ার মঞ্চ উপহার দেন আরও একবার৷ ২০১২ সালে পুণে ওয়ারিয়র্সের হয়ে সৌরভ কলকাতায় আইপিএল খেলতে এলে যেমন আহব তৈরি হয়েছিল, কোচিং স্টাফ হিসাবে হলেও এবার ইডেনে কেকেআরের প্রতিপক্ষ শিবিরে দাদা উপস্থিত থাকায় আবহটা উত্তেজক রূপ নিয়েছিল ঠিক সেরকমই৷

ম্যাচটাকে দিল্লি বনাম কলকাতা হিসাবে দেখছিল গোটা দেশ৷ তবে বাংলার ক্রিকেটমহলে এটা ছিল দাদা বনাম শাহরুখের প্রছন্ন লড়াই৷ সেই লড়াইয়ে ঘরের দল কেকেআরকে পাশে থাকলেও ইডেনের গ্যালারিকে দাদাকে সমর্থন করতে কুণ্ঠা বোধ করেনি৷ দিনের শেষে ব্যক্তিগত লড়াইয়ে শাহরুখের ফ্র্যাঞ্চাইজিকে টেক্কা দিয়ে গেলেন সৌরভ, ঠিক যেমনটা কোটলার প্রথম পর্বেও সুপার ওভারে রাসেলদের মাৎ করেছিল তাঁর দুঁদে ক্রিকেট মস্তিষ্ক৷ ক্রিকেটার হিসাবে পারেননি, তবে মেন্টর হিসাবে নাইটদের সব উপেক্ষার জবাব দিয়ে গেলেন তিনি৷

আরও পড়ুন: ব্রেট লি’র বিষাক্ত বাউন্সারে ব্রিবত লারা

ম্যাচের আগাগোড়া স্পটলাইটে ছিলেন সৌরভ৷ অনুশীলনে গেমপ্ল্যান স্থির করা থেকে টিম হার্ডলে দলকে উদ্দীপ্ত করা পর্যন্ত সবেতেই মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন সৌরভ৷ যা দেখে ক্যাপ্টেন সৌরভের পুরনো ছবি স্মৃতিপটে ফিরে আসতে বাধ্য৷ শুধুমাত্র সৌরভের জন্যই দিল্লির হয়ে গলা ফাটাতে হাজির ছিলেন বিপুল পরিমাণ সমর্থক৷ ধাওয়ানদের দাদাগিরিতে যতটা না উদ্বেলিত হয় ইডেনের গ্যালারি, তার থেকে কয়েকগুন বেশি চিৎকার শোনা যাচ্ছিল মাঠে সৌরভের দেখা মিললেই৷ জায়ান্ট স্ক্রিণে ডাগ আউটে বসা সৌরভের ছবি ফুটে উঠতেই যেভাবে উদ্বেলিত হয় ইডেন, তা দেখে অবাক দিল্লি শিবিরও৷ প্রবীণ আমরে, রিকি পন্টিংরা আঙুল দেখিয়ে বুঝিয়ে দেন, এই ম্যাচে দিল্লির নেপথ্যের নায়ক আসলে মহারাজই৷

শুধু একটাই যা আক্ষেপ৷ প্রথম দু’টি ম্যাচে ইডেনের গ্যালারিতে উপস্থিত থাকলেও শাহরুখ মাঠে আসেননি এই ম্যাচে৷ তাহলে দাদা বনাম এসআরকে লড়াই বাড়তি মাত্রা পেত নিশ্চিত৷ সশরীরে উপস্থিত না থাকলেও অঘোষিত এই ডুয়েলে সৌরভের কাছে হেরে তাঁকে অভিনন্দন জানাতে ভোলেননি শাহরুখ খান৷ টুইটারে তিনি দিল্লিকে শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি ইডেনে সৌরভের উপস্থিত থাকাকে ম্যাচের একমাত্র ইতিবাচক দিক হিসাবে বর্ণনা করেন৷

আরও পড়ুন: বিরাটের দলে ফিরছেন পুরনো সৈনিক

ম্যাচে মাঠের নায়ক অবশ্যই শিখর ধাওয়ান৷ শেষমেশ শতরানের দোরগোড়ায় এসে থেমে যেতে হওয়ায় ধাওয়ানের জন্য মনখারাপের আবহও ছিল ইডেনে৷ কেননা, টি-২০’তে বহু স্মরণীয় ইনিংস খেললেও এখনও সেঞ্চুরির গণ্ডি পেরোননি গব্বর৷ ইডেনের অপরাজিত ৯৭ রানই তাঁর আইপিএল তথা টি-২০ কেরিয়ারের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস৷ মূলত ধাওয়ানের চওড়া ব্যাট ও ঋষভ পন্তের ৪৬ রানের কার্যকরী ইনিংসের সুবাদে কলকাতার ঝুলিয়ে দেওয়া ১৯৮ রানের লক্ষ্য অনায়াসে ছুঁয়ে ফেলে দিল্লি৷ সাত বল বাকি থাকতেই সাত উইকেটে ম্যাচ জিতে লিগ টেবিলের চার নম্বরে উঠে আসে ক্যাপিটালস৷