চীনকেই না একদিন গাইতে হয়, বল মা শ্যামা দাঁড়াই কোথা!

দলাই লামার সাম্প্রতিক তাওয়াং সফরকে কেন্দ্র করে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের বেশ কিছুটা অবনতি ঘটায় ভারত সরকারের তরফে দুই দেশের মধ্যে উষ্ণতা ফিরিয়ে আনার একটা উদ্যোগ আবার নেওয়া হচ্ছে৷ দিল্লির আশা, আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনে বেজিংয়ের সঙ্গে ভারতের বৈষয়িক সম্পর্ককে মেরামত করা যাবে৷ সেজন্য ভারতের বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের নেতৃত্বে ক্যাবিনেট স্তরের তিন সদস্য সেদেশে যাচ্ছেন৷ ভারতের দিক থেকে আশঙ্কা বাড়ার একটি কারণ, দলাই লামার তাওয়াং সফরের পর পরই হঠাৎ করে নেপালের সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া চালিয়েছে চীন৷ বলা বাহুল্য, ভারতকে চাপে রাখতেই তারা এটা করেছে৷  তাদের এই মহড়ার উদ্যোগ থেকে আরও একটা জিনিস পরিষ্কার৷ ভারতের নেপাল সীমান্তে ইদানীং যে ঝামেলা পেকেছিল, তার পিছনে ছিল চীনা এজেন্টদেরই মদত৷

নিখিলেশ রায়চৌধুরী

ভারত সরকার তার বৃহৎ প্রতিবেশীর মান ভাঙাবে কীভাবে, কোন কূটনৈতিক পথে— সেটা ভাবার জন্য দিল্লির পররাষ্ট্র দফতরে অনেক পাকামাথার ব্যক্তি আছেন৷ কিন্তু ভারতের তরফ থেকে একটা ব্যাপার বিবেচনায় রাখা ভালো৷ চীনের শাসককুল তাদের আগ্রাসী নীতি থেকে কখনই সরে আসবে না৷ প্রথমত, তিব্বতের নিজস্ব সংস্কৃতি ও সত্তাকে চিরতরে লুপ্ত করে দিতে চীনা বুলডোজার আগেও যেমন চলেছে, তেমনটা আগামী দিনেও চলবে৷ দ্বিতীয়ত, ভারতের যে যে অংশে তিব্বতি সংস্কৃতির চিহ্ন রয়েছে সেগুলিকেও হস্তগত করে সেখানে ঘুঘু চরানোর স্ট্র্যাটেজি থেকে তারা কোনও দিনই পিছপা হবে না৷ চীনে যত দিন কমিউনিস্ট শাসনের নামে আগ্রাসী জাতিদম্ভের ধ্বজা উড়বে তত দিন এই নীতির হেরফের ঘটবে না৷ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই প্রয়াস বেজিং চালিয়ে যাবে৷

খবরে প্রকাশ, চীনে আবারও একজন তিব্বতি লামা প্রকাশ্যে আত্মাহুতির চেষ্টা করেছেন৷ যদিও তিনি বেঁচে আছেন, না মারা গিয়েছেন— সে কথা আর জানা যায়নি৷ পশ্চিম তিব্বতের এক শহরে (গুনজি) রাস্তার উপর ওই ঘটনা ঘটতে দেখেই চীনা নিরাপত্তাবাহিনী তাঁকে টেনে নিয়ে চলে যায়৷ শেষ পর্যন্ত সেই বৌদ্ধ লামার যে কী হল— কেউই আর জানতে পারেনি৷ ২০০৮ সালে বেজিং ওলিম্পিক্সের পর থেকে এখনও পর্যন্ত তিব্বতে প্রায় দেড়শ লামা এভাবে আত্মাহুতি দিয়েছেন৷ এগুলি জানা ঘটনা৷ বাস্তবে চীনের মতো দেশে যা ঘটে, সেই তুলনায় খুব কম ঘটনাই বাইরে জানাজানি হয়৷

- Advertisement -

সেই ১৯৫০-এর দশকে দেশান্তরী হওয়ার আগে থেকে দলাই লামার দাবি ছিল একটাই৷ স্বায়ত্তশাসন৷ তিনি পৃথক রাষ্ট্র চাননি৷ অথচ, কখনই তাঁর এবং তিব্বতি জনজীবনের সেই দাবিকে লালচীন পাত্তা দেয়নি৷ পাত্তা না দেওয়ার একটি বড় কারণ— তিব্বতি সংস্কৃতি কখনই তাদের ঐতিহ্যে ভারতের অবদানকে অস্বীকার করেনি৷ চীনের উগ্র জাতিদম্ভ যেটা করে থাকে৷ তিব্বতের মানুষ গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে যে, ভারতের বৌদ্ধ শ্রমণরা পদার্পণ করার আগে পর্যন্ত তিব্বতের অধিবাসীরা ছিল হিংস্র যোদ্ধা জাতি৷ তারা পরস্পরের মধ্যে অনবরত মারামারি করত৷ শুধু তাই নয়, সপ্তম ও অষ্টম খ্রিস্টাব্দে যোদ্ধা জাতি হিসাবে তাদের এমন দাপট ছিল যে, গোটা মধ্য এশিয়ায় তিব্বতের সাম্রাজ্য ছিল সব থেকে বড়৷ কিন্তু ভারতের বৌদ্ধ শ্রমণদের আবির্ভাবে এমন একটা জাতি আগাগোড়া যেন ম্যাজিকের মতো রূপান্তরিত হয়ে গেল৷ তারা চিরতরে হিংসার পথ ছেড়ে অহিংসার শরণ নিল৷ বাঙালি হিসাবে আমরা গর্ব করতে পারি, তিব্বতের সেই ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরে একটি বড় ভূমিকা ছিল খাঁটি বঙ্গসন্তান অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের৷ পশ্চিম তিব্বতের একটি বিশাল অংশের গুরুত্বপূর্ণ জনগোষ্ঠী শাক্য সম্প্রদায় নামে পরিচিত৷ এই শাক্য সম্প্রদায়ের বৌদ্ধ লামারা কিন্তু অতীশ দীপঙ্করেরই অনুগামী৷

তিব্বত তো আগাগোড়াই বৌদ্ধ৷ কিন্তু তিব্বত ছাড়াও মূল চীনকে ধরলে সেখানকার মাটিতেও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরাই আজও সংখ্যাগরিষ্ঠ৷ চীনের কমিউনিস্ট শাসককুল কখনই তা স্বীকার করে না৷ কারণ, সে কথা স্বীকার করতে হলে তাদের এটাও মানতে হবে যে, প্রাচীন যুগে মূল চীনেও বৌদ্ধধর্ম পৌঁছেছিল দুই ভারতীয় ভিক্ষুর হাত ধরে৷

চীন এখন তার উগ্র জাতিদম্ভের সঙ্গে সামরিক শক্তি ও প্রাচুর্যকে পাঞ্চ করে গোটা বিশ্বজয়ের স্বপ্নে বিভোর৷ কিন্তু ঘুণপোকার মতো তাদের নিজেদের আত্মিক শক্তিটাই লোপ পেতে বসেছে৷ সেখানকার বেশিরভাগ মানুষ আর পুনর্জন্মে চীনা হয়ে জন্মাতে চায় না৷ পক্ষান্তরে জাতিধর্মনির্বিশেষে আশি শতাংশেরও বেশি ভারতবাসী আবার ভারতের মাটিতেই জন্মাতে চায়৷ বাস্তবে তিব্বতের দাবি ও সংস্কৃতিকে মাটিতে মিশিয়ে দিয়ে চীনের উগ্র জাতিদম্ভ জিততে চাইছে৷ সেইসঙ্গে দলাই লামার বন্ধু বলে ভারতকেও অনবরত অপদস্থ করতে চাইছে৷ কিন্তু যেদিন তারা ‘জিতে গিয়েছি’ বলে লাফিয়ে উঠবে, দেখবে হয়তো তাদের নিজেদেরই আর পা রাখার জায়গা নেই৷

All rights reserved by @ Kolkata24x7 II প্রতিবেদনের কোন অংশ অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ
-