নয়াদিল্লি: অটলবিহারী বাজপেয়ী৷ তিনিই প্রথম অ-কংগ্রেসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী যিনি ৫ বছরের সম্পূর্ণ মেয়াদ পূর্ণ করেছিলেন৷ ভালো মানুষ, দেশ নেতা, কবি ও সাহিত্য অনুরাগী হিসাবে তাঁকে মনে রাখবে দেশবাসী৷ কিন্তু প্রশাসক হিসাবেও তাঁর কর্মকাণ্ড প্রসংশার দাবি রাখে৷

মোট ১০ বারের সাংসদ৷৷ তিন বারের প্রধানমন্ত্রী৷ ১৯৯৯ থেকে ২০০৪ মেয়াদ কালেই বাজপেয়ীর শাসনকালে নেওয়া বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত, দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে দিয়েছিল৷ যেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য সর্বশিক্ষা অভিযান, পোখরান, সোনালী চতুর্ভুজ, টেলিকমিউনিকেশন বিপ্লব, রাষ্ট্রীয় সংস্থা বেসরকারিকরণ, বিজ্ঞান ও গবেষণা এবং শান্তি উদ্যোগ৷

সর্বশিক্ষা অভিযান: সকলের জন্য শিক্ষা৷ মূলত এই লক্ষ্যই প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ীর আমলে শুরু হয় সর্বশিক্ষা অভিযান প্রকল্প৷ ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী সব পড়ুয়ারাই বিনামূল্যে এই প্রকল্পের মাধ্যমে পড়ার সুযোগ পেয়ে থাকেন৷ এই প্রকল্প চালুর ফলে দেশে পড়ুয়া ড্রপ আউটের সংখ্যাও অনেকটা কমে গিয়েছে৷ বেড়েছে শিক্ষার হার৷ পরিসংখ্যান বলছে, ২০০১ সালে যেখানে শিক্ষার হার ছিল ৬৪.৮ শতাংশ , সেখানে ২০১১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭৪.৪ শতাংশে৷

পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র ভারত: ১৯৭৪ সালের পর ১৯৯৮৷ পোখরানে দ্বিতীয়বারের জন্য পরমানু বোমার পরীক্ষা করে ভারত৷ অটলবিহারী বাজপেয়ীর সাহসী সিদ্ধান্ত সেদিন চমকে দিয়েছিল গোটা বিশ্বকে৷ পোখরান-২ এর পর মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্র, কানাডা, ব্রিটেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান ভারতের উপর আর্থিক নিষেধাজ্ঞা জারি করে৷ কিন্তু তাতে দমে যায়নি ভারত৷ প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ীর কড়া সিদ্ধান্তের জেরেই ভারত পায় পরমাণু শক্তিধর রাষ্টের মর্যাদা৷

শান্তি উদ্যোগ: বিদেশমন্ত্রী থাকাকালীন বাজপেয়ী বলেছিলেন, ‘‘প্রতিবেশীকে বদলানো যায় না৷ তাদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখাটাই কর্তব্য৷’’ প্রধানমন্ত্রী হয়েও এই নীতিতে আস্থা রেখে অটলবিহারী পাকিস্থানের সঙ্গে শান্তিস্থাপণের উদ্যোগ শুরু করেন৷ তাঁর আমলেই শুরু হয় দিল্লি লাহোর বাস যাত্রা৷ প্রথম বাসে চেপে লাহোর যান বাজপেয়ী৷ এরপরই ইসলামাবাদ ঘোষণা করে পাকিস্থানের মাটি ভারত বিরোধী কার্যকলাপে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না৷ শুরু হয় দুই প্রতিবেশীর মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্কও৷ কিন্তু পাক সেনাদের এই শান্তি পক্রিয়া পছন্দ হয়নি৷ ১৯৯৯ সালে পার সেনাবাহিনী জঙ্গিদের সঙ্গে নিয়ে কার্গিল, আখনোর দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে৷ তাদের হটাতে শুরু হয় ‘অপরেশন বিজয়’৷ ৯৯এর মে থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ জুলাইয়ে শেষ হয়৷

বাজপেয়ীর নির্দেশে ভারতীয় সেনার প্রবল প্রতাপের সামনে পরাজয় স্বীকার করে পাক বাহিনী৷ এরপরও পাক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মুশারফের সঙ্গে আগ্রা শীর্ষ সম্মেলনের মাধ্যেমে শীতল সম্পর্ক জোড়া লাগানোর চেষ্টা করেছিলেন বাজপেয়ী৷ কিন্তু মুশারফ সীমান্ত সন্ত্রাসের কথা না মেনে নেওয়ায় ভেস্তে যায় বৈঠক৷ তবুও পাকিস্থানের সঙ্গে শান্তি আলোচনার এই প্রয়াস বিশ্ব রাজনীতিতে ভারতকে অন্য স্থানে নিয়ে গিয়েছিল৷

সোনালী চতুর্ভুজ: প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ীর অন্যতম সেরা কৃতীত্ব ১৯৯৯ সালে দেশকে উন্নত সড়াক জাল দিয়ে সংযোগস্থাপণ৷ ৫৮৪৬ কিলোমিটার ‘সোনালী চতুর্ভুজ’ প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের চারটি মেট্রো শহর দিল্লি, কলকাতা, মুম্বই ও চেন্নাইকে জুড়েছিল৷ যা দেশের সড়ক যোজনা ক্ষেত্রে বিপ্লব বলে গণ্য হয়৷ ২০১২ সালে শেষ হওয়া এই প্রকল্পের ফলে গোটা ভারতে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছিল৷

টেলিকমিউনিকেশন বিপ্লব: ভারতীয় টেলিকমিউনিকেশন ক্ষেত্রের স্থপতিকার হিসাবে গণ্য হন অটলবিহারী বাজপেয়ী৷ টেলিকমিউনিকেশন ক্ষেত্রে স্থায়ী অনুমোদন ভিত্তিক রাজস্বের নীতি থেকে বেড়িয়ে তাঁর আমলেই সূচনা হয় রাজস্ব বন্টন চুক্তি৷ বাজপেয়ী আমলেই মধ্যবিত্তের নাগালে আসে টেলিফোন পরিষেবা৷ ৩২ মিলিয়ান টেনিপোন হ্যান্ডসেট বিক্রি হয় ভারতে৷

বেসরকারিকরণ: বাণিজ্যে সরকারি হস্তক্ষেপ বা ভর্তুকির বিরোধী ছিলেন প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ী৷ বদলে বেসরকারি বিলগ্নিকরণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পায় বলে মনে করতেন তিনি৷ সেই লক্ষ্যেই বাজপেয়ীর আমলে তৈরি হয় বিলগ্নিকরণ মন্ত্রক৷ বিএসএনএল ও ইন্ডিয়ান পেট্রোকেমিক্যাল কর্পোরেশন লিমিটেডের বিলগ্নিকরণের শুরু অটলবিহারীর জমানাতেই৷ বাজপেয়ীর সময়ে তৈরি বিলগ্নিকরণ মন্ত্রক বর্তমানে Department of Investment and Public Asset Management নামে পরিচিত৷

বিজ্ঞান ও গবেষণা: দেশের ৫৬তম স্বাধীনতা দিবসে প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ীর ঘোষণা ছিল ভারতীয় প্রযুক্তিতে তৈরি মহাকাশযান চন্দ্রযান ১ মহাকাশে পাড়ি দেবে৷ যা ভারতীয় মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ৷