শেখর দুবে, কলকাতা: কয়েকদিন আগে জনপ্রিয় বাংলা দৈনিকের এক প্রবীন সাংবাদিক কথা প্রসঙ্গে বলছিলেন কোনও ঘটনাকে খবর বানানোর জন্য সোশ্যাল মিডিয়া বিশেষ দায়িত্ব পালন করছে৷ আগামী দিনে সোশ্যাল মিডিয়ার এই দায়িত্বটা আরও বাড়বে৷ সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনে বাংলার নেতা নেত্রীরা পুরোদমে সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করেছেন সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য৷ বিশেষ করে জনপ্রিয় সোশ্যাল মাধ্যম ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টুইটারে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে বিতর্কও চলেছে৷ দুই ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের নেতাদের এই বিতর্ক যেমন মজাদার হয়েছে আবার কখনও শালীনতার মাত্রা ছাড়িয়েছে৷

আলোচনা কিংবা বিতর্ক যে ধরণেরই হোক না কেন, রাজনৈতিক নেতারা যে সোশ্যাল মিডিয়াকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছেন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না৷ সোশ্যাল মিডিয়াতে ভোট প্রচারে নতুন কিছু না হলেও এ ব্যাপারে এগিয়ে রয়েছে বিজেপি৷ দেশের প্রধানমন্ত্রী অভিনেতা অক্ষয় কুমারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ফেসবুক, টুইটারের জনমতের আভাস পাওয়ার বিষয়ে কথা বলেছেন৷ সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনে বাংলার রাজনৈতিক দলের নেতার সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকেননি৷ এব্যাপারে সবার প্রথমে যে দুটি নাম নিতে হয় তারা হলেন আসানসোলের বিজেপি সাংসদ বাবুল সুপ্রিয় এবং হুগলি থেকে জিতে আসা বিজেপি সাংসদ এবং রাজ্য বিজেপির মহিলা মোর্চার সভাপতি লকেট চট্টোপাধ্যায়৷

বিভিন্ন ইস্যুতে বিরোধিদের সোজাসাপ্টা আক্রমণের পাশাপাশি ফেসবুক, টুইটারের জেন-Y কে উদ্দেশ্য করে হিউমার মিশ্রিত পোস্ট করেন৷ যেমন আসানসোলে মুনমুন সেন তৃণমূলের প্রার্থী ঘোষণার পর টুইটারে বাবুলের প্রতিক্রিয়া ছিল, ‘‘দিদি আমার জন্য সেনসেশনাল সব বিরোধী খুঁজে আনেন৷ ওঁকে ধন্যবাদ৷’’ কিংবা বাংলায় জয় শ্রী রাম বিতর্ক তৈরি হওয়ার পর বাবুল ফেসবুকে লেখেন , ‘‘ কালিঘাট – এর মোড়ে শ্রীরামচন্দ্রর একটি মর্মর মূর্তি বানানোর জন্য সরকারি ভাবে আবেদন করা হোক, দেখি দিদিমনি সরকারিভাবে না বলার সাহস দেখতে পারেন কিনা !! জয় শ্রী লবকুশ – এর বাবা, I mean জয় শ্রী রাম’’

বিজেপির জয় শ্রী রাম ধ্বনির পালটা গেরুয়া দলের নেতাদের নম্বরে পৌঁছে যাচ্ছে ‘জয় হিন্দ’ লেখা৷ অর্জুন সিং, বাবুল সুপ্রিয়র পর সেই লেখা পৌঁছে গিয়েছে হুগলির সাংসদ লকেট চট্টোপাধ্যায়ের মেসেজ বক্সেও৷ যার স্ক্রিনশট ফেসবুকে তুলে ধরে সাংসদের উত্তর, এই ধরণের মেসেজে তিনি গর্বিত৷ ফেসবুকে লকেট লেখেন, ‘‘কাল থেকে আমার ফোনে জয় হিন্দ এবং জয় বাংলা যারা এসএমএস করছেন তাদের সবাইকে আমি উত্তর দিতে পারিনি, তাই এখানেই উত্তরটা দিলাম।

একজন ভারতবাসী ও একজন বাঙালি হয়ে এই এসএমএস পেয়ে আমি গর্বিত বোধ করি৷ আগামী দিন আমরা সবাই একসাথে হয়ে পথ চলবো সোনার বাংলা তৈরি করবার লক্ষ্যে৷ ভালো থাকুন, সুস্থ হয়ে উঠুক আমাদের মুখ্যমন্ত্রী। জয় হিন্দ, জয় বাংলা ,জয় শ্রী রাম আমাকে আরো শুভেচ্ছা পাঠানোর অনুরোধ রইল৷’’

তরুণ বাম নেতা শতরূপ ঘোষ লোকসভা নির্বাচনে না লড়লেও সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার রাজ্যের শাসক দলের বিরোধিতা করেছেন৷ মুনমুন সেনের ‘মায়ের আত্মার শান্তির জন্য আমাকে ভোট দাও’ বক্তব্যের পর শতরূপ ফেসবুকে লিখেছিলেন, ‘‘উনি যদি ওর মায়ের আত্মার শান্তি চান তাহলে তাঁর শ্রাদ্ধ করুন , জনগনের শ্রাদ্ধ করছেন কেন?’’

সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনে বাংলায় বাম প্রার্থীরা ভোটে হেরে গেলেও সোশ্যাল মিডিয়া প্রচারে পিছপা ছিলেন না৷ যাদবপুরে বামেদের প্রার্থী ছিলেন বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য৷ নির্বাচন চলাকালীন তো বটেই ভোট শেষের পরও ফেসবুকে টুইটারে নানা ইস্যুতে লিখে থাকেন বিকাশ৷ ফেসবুকে প্রচুর ফলোয়ার রয়েছে বিকাশের লেখার৷ এছাড়াও তৃণমূলের ডেরেক’ও ব্রায়েন , মহুয়া মিত্র, অভিষেক বন্দোপাধ্যায়ও সোশ্যাল মিডিয়াতে অ্যাক্টিভ থেকে ২০২১ সালে বাংলার বিধানসভার তৃণমূলকে ফেরানোর লড়াইয়ের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন৷ অন্যদিকে খোদ সফটওয়্যার কোম্পানির মালিককে কংগ্রেস মিডিয়া সেলের প্রধান করেছে৷ মিতা চক্রবর্তী দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ফেসবুকে কংগ্রেসের আলোচনা জোরালো হয়েছে৷

এছাড়াও বাংলা রাজনীতির রবিনহুড অধীর চৌধুরীকেও ফেসবুকে নিজের জাতীয়তাবাদ এবং রাজনীতি নিয়ে একাধিকবার পোস্ট করতে দেখা গিয়েছে৷ ভোটের পর তৃণমূল নেতাদের বিজেপিতে যাওয়া প্রসঙ্গে ফেসবুকে অধীর লেখেন, ‘‘ভাঙছে তৃণমূল, দল ছেড়ে পালাচ্ছে ‘দিদি’র বাহিনীর নক্ষত্রকূল!’দিদি’র দল ভাঙ্গাচ্ছে মোদির দল! ‘দিদি’ ভাবছে কাদেরকে মানুষ করলাম, ‘দিদি’র অসময়ে পালাচ্ছে!একদিন আমারও মনে হয়েছিল ― History has a nasty habit of repeating itself বলবো, নাকি বলবো ― Poetic Justice ! ভাবছি।’’

বিজেপি রাজ্যসভাপতি দিলীপ ঘোষও এ ব্যাপারে পিছিয়ে নেই৷ শাসকদলের বিভিন্ন ভুল ভ্রান্ত ও জনবিরোধ কাজের খতিয়ান তিনি ফেসবুকের মাধ্যমেই তাঁর চারলক্ষের বেশি ফলোয়ারের কাছে তুলে দিয়েছেন৷ ভোট চলাকালীন একটি পোস্টে দিলীপ ঘোষ লেখেন, ‘‘তৃণমূল সরকারের, রাজ্য সরকারি কর্মচারী এবং শিক্ষকদের প্রতি অবহেলা, বঞ্চনা এবং অসম্মানজনক ব্যবহারের যোগ্য জবাব এই নির্বাচনে তারা দিয়েছেন৷ সবাই পরিবর্তন থেকে পরিত্রাণ চাইছেন৷’’