অরিন্দম লাহা, বিভাগীয় প্রধান, বাণিজ্য বিভাগ, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়

ঘটনা 1: Lockdown দেশ, পৌঁছতে হবে বাড়ি: ২০০ কিমি পথ হেঁটে মৃত্যুর কোলে যুবক

ঘটনা 2: করোনা রক্ষায় শরীরেই তৈরি সুরক্ষাবলয়, শহরে বসছে নির্বিষ খাদ্যপন্যের

ঘটনা 3: লকডাউনের মধ্যে আনন্দ বিহার বাস টার্মিনালে ভয়াবহ ছবি

এই অযাচিত ঘটনাগুলি মূল কি সূত্রে গাঁথা? মানুষ কেন নিজের জীবন বিপন্ন করে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে নারাজ? এটি কি অশনি সংকেতের চিহ্ন (বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় রচিত একটি উপন্যাস অনুসরণে)?

প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ প্রণব সেন সম্প্রতি ‘খাদ্য দাঙ্গা’র ন্যায় এমনই একটি পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন । যাইহোক আসলে এখন যা অবস্থা তাতে এটি খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার প্রতিফলন, খাদ্যের অধিকারের অভাবের ভয়।

যদিও সরকারের আশ্বাস যে ৪৩৫ লক্ষ টন উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্য রয়েছে, যার মধ্যে ২৭২.১৯ লক্ষ টন চাল এবং ১৬২.৭৯লক্ষ টন গম। এই তথ্য বলছে দেশে খাদ্যের সহজলভ্যতা (food availability) স্পষ্টতই। কিন্তু করোনা রুখতে লকডাউনের দেশে পরিবার পিছু জন্য খাদ্য প্রাপ্যতা (food access) নিশ্চিত করার তেমন কোনো চেষ্টা না দেখে ভয়টা স্বাভাবিক।

পর্যাপ্ত খাবারের প্রাপ্যতা ক্রয়ের ক্ষমতার উপর নির্ভর করে যা এখন ক্রমবর্ধমান কর্মসংস্থানের সঙ্কটের মধ্যে পড়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে।

খাদ্যে প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার জন্য আমরা এখন সংক্ষিপ্ত মেয়াদী থেকে মাঝারি মেয়াদীর মতো অর্থনৈতিক উদ্ভাবনী নীতি বিকল্পগুলির মূল্যায়ন করতে পারি। (যদিও কেইন্সিও অর্থনীতির ন্যায় “দীর্ঘমেয়াদে আমরা সবাই মারা যাব” এমনটি অনুমান এখনো করছি না)

প্রথমত:
শুধুমাত্র বিপিএলের তালিকার উপর নির্ভর না করে, বরং অসংগঠিত কর্মীদের নিযুক্ত করে অবিলম্বে খাদ্য নিরাপত্তাহীন ব্যক্তিদের একটি বিস্তৃত তালিকা প্রস্তুত করা দরকার।

তাহলে কী করতে হবে ?

সামাজিক সুরক্ষার আওতায় সুবিধাভোগীদের তালিকা প্রস্তুত করা। এতে কেন্দ্রীয় সরকার সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প-প্রধানমন্ত্রী শ্রম যোগী মান ধন বা তুলনীয় রাজ্য স্পনসরড স্কিমগুলি, যেমন পশ্চিমবঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা যোজনাকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ জিন ড্রেজ আবার গ্রামীণ অঞ্চলের জন্য জব কার্ড এবং শহুরে অঞ্চলের জন্য পিএমজেডিওয়াই অ্যাকাউন্ট বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়েছেন। ডেটা মাইনিং টিম বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় লক্ষ্য নির্ধারণের ত্রুটিগুলি এড়িয়ে একটি সম্পূর্ণ তালিকা তৈরি করা প্রয়োজন।

সামাজিক এজেন্টদের (যেমন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, ক্লাব, এনজিও, ডাক সেবক) সহায়তায় জনগণের দোরগোড়ায় খাদ্যশস্যের সরবরাহের এক সম্ভাব্য উপায় হতে পারে।

এই এজেন্টদের কমপক্ষে সাপ্তাহিক ভিত্তিতে খাদ্য বিতরণ এবং খাদ্য কুপন (পরবর্তী কয়েক সপ্তাহের জন্য খাদ্য বিতরণের একটি প্রতিশ্রুতি নোট) জারি করে খাবারের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার অনুমতি দেওয়া যেতে পারে।

জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইন, ২০১৩-খসড়া অনুসরণ করে, রাজ্যগুলিকে খাদ্যশস্যের দোরগোড়ায় সরবরাহের কাজটি কার্যকর করার জন্য উপযুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক বিতরণ এজেন্টদের বাছাই করার দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে।

Point of Service (POS) ডিভাইসের সাহায্যে সরকার এই জাতীয় উদ্যোগের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে পারে

দ্বিতীয়ত:
উদ্বৃত্ত খাদ্য কোনো সরকার আপাততভাবে মজুত না করে সাধারণ জনসাধারণের (যারা সরকারি বিতরণ ব্যবস্থার বাইরে আছে)মধ্যে বিতরণ করুন। সরকার এখন এই সার্বজনীনকরণ বিতরণ ব্যবস্থা (Universal Public Distribution System) বিবেচনা করে দেখতে পারে।

প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতির মাধ্যমে ‘যোগাযোগ ব্যাতিত ডেলিভারি সিস্টেম’ (যেমন ব্রিটেনে আছে) সরকারি খাদ্য সংস্থান ব্যবস্থার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীর খাদ্য সংস্থাণের আরেকটি নীতিগত বিকল্প হতে পারে।

তৃতীয়ত:
দেশব্যাপী মহামারী পরিস্থিতিতে খাদ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে রেশন কার্ড বহনযোগ্যতা বা এক জাতি – একটি কার্ড (Ration card portability or One Nation-One Card) ব্যবস্থার উপযোগিতা বোঝা যায়। যদিও এই ব্যবস্থা ২০২০ সালের ১ লা জুলাই পুরোপুরি কার্যকর হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

ইতিমধ্যে ১৬ টি রাজ্য এই জাতীয় উদ্যোগে অংশ নিয়েছে। এমন একটি জাতীয় উদ্যোগের প্রক্রিয়াটি ত্বরান্বিত করা দ্রুত প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

সর্বশেষে বলা যায়, এই সংকটে দরিদ্র পরিবারের কল্যাণে জনসাধারণের সহায়তার হাত বাড়ানোয় ‘জনভাগিদারী’(নাগরিকের মধ্যে সংহতির অনুভূতি) একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

ভারতীয় অভিজ্ঞতা বলেছে যে সংহতির বোধ সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচির (বিশেষত স্বচ্ছ ভারত, দক্ষ ভারত, পরিষ্কার গঙ্গা, দুর্নীতি দমন অভিযান) সার্থক রূপায়ণে সহায়তা করে থাকে । ‘করুণা’ প্রকল্প রূপায়ণে (আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর “করুণা দিয়ে করোনাকে জবাব দেওয়ার” মন্ত্র) বা জরুরি তহবিল গঠনে ‘জনভাগিদারি’ চেতনার উন্মেষ ঘটবে বলে মনে করা যেতে পারে।

সবই সম্ভব, তবে দেরি হলে বিপদ।