সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : সোশ্যাল সোশ্যাল ডিস্টেন্সিং মানা নিয়ে এখনও প্রচুর প্রশ্ন উঠছে। বিশেষত বাজারে গেলে সোশ্যাল ডিস্টেন্সিংয়ের বিষয়টি কতটা বিশ্রীভাবে নষ্ট হচ্ছে তা স্পষ্ট। এত বার বলার পরেও ঘাড়ে উঠে ছোঁ মেরে আগে জিনিস কিনে নিয়ে পালাবার প্রবণতা যাচ্ছে না। পুলিশ শত চেষ্টা করেও পারছে না আবার ঘনবসতির জন্য, কারণ এক জায়গায় যত বেশি মানুষ বসবাস করে সেই সমস্ত মানুষ শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাজার দোকান করতে এলে ভিড় হবেই। সেখানে পুলিশের ফেল মেরে যাওয়া স্বাভাবিক। কারণ, ‘আকাশ গিয়েছে চুরি’

স্পষ্ট করে বলা যাক। সরকারের পূর্ব পরিকল্পনার ভুল তুলে ধরছেন পরিবেশবিদ সুভাস দত্ত। তিনি বলতে চাইছেন সরকার এত জমি জায়গার ছাড় দিয়ে দিচ্ছে ছোট জায়গার মধ্যে ফলে বাড়ি বাড়ছে। বাড়ির ঘরের ঠেলায় শহরে আকাশ দেখা যায় না। ফলে আকাশ চুরি হয়ে যাচ্ছে। করোনার মতো ভাইরাসে যেখানে সামাজিক দুরত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেখানে আকাশ চোরের দল অর্থাৎ হাজার হাজার সাধারণ মানুষ একটি নির্দিষ্ট সময়ে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় উপস্থিত হয়ে সব নিয়ম ভেঙেচুড়ে দিচ্ছে। এতে বাড়ছে বিপদ। আর এখানেই সরকারের দোষ কোনটা তা বুঝিয়ে বলেছেন পরিবেশবিদ।

সুভাষ দত্ত বলেছেন , ‘অপরিকল্পিত নগরায়ন বন্ধ না হলে করোনা থেকে বাঁচা সমস্যার। ভবিষ্যতেও আরও সমস্যা বাড়বে। ৮০-র দশকের মাঝামাঝি সময়ের একটা অভিজ্ঞতা আজ মনে পড়ছে। তখন পকেটের জোর ছিল না কিন্তু গায়ের জোর হিল – তাই হেঁটে হেঁটেই শহরের বিভিন্ন বিষয়ে সমীক্ষা চালাতাম। পুকুর চুরি কথাটা জানতাম কিন্তু একেবারেই জানা ছিল না যে আকাশটাও চুরি হতে পারে। জুট মিলের জায়গা এবং বস্তিগুলিতে তখন বহুতল জাঁকিয়ে উঠছে, ঠাসাঠাসি বাক্স বাড়ি। কেন জানিনা কথাটা মাথায় এলো – এ যে দেখছি আকাশচুরি”। রাস্তা দিয়ে হাঁটলে আকাশ দেখা যায় না। পরবর্তী পর্যায়ে লক্ষ করলাম যে, চুরি নয় , পুরো আকাশটাই ডাকাতি হয়ে গিয়েছে।’ তিনি বলছেন , ‘রসিকতা নয়। আসলে বলতে চাইছি অপরিকল্পিত নগরায়নের কথা। যেন অনবরত বলেই চলেছে – ‘দেখ আমি বাড়ছি মাম্মি’। সল্টলেক এবং রাজারহাটে কিছুটা পরিকল্পনার ছাপ রয়েছে, কিন্তু কলকাতা, হাওড়ার অন্য কোর এলাকায় ছোট বাড়িগুলোকে ইতিহাস বানিয়ে নতুন যে ভূগোলটা তৈরী হয়েছে বা হচ্ছে তাতে কিন্তু লুকিয়ে থাকছে বিপর্যয়ের বিড়ম্বনা। একটাও রাস্তা বাড়েনি বা চওড়াও হয়নি, ভূগর্ভস্থ পয়ঃপ্রণালী এবং জলসরবরাহ ব্যবস্থাও একই রয়েছে, এমনকি একটা বাজারও নতুন করে গড়ে তোলা হয়নি বা বাড়েনি – তবুও হু হু করে বহুতল বেড়েছে। ১০০ মানুষের জায়গায় ১০০০ মানুষ গাদাগাদি করে বসবাস করছে। কয়েকটি এলাকাতো এখন পৃথিবীর অন্যতম জনবহুল বসতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। করোনার ফলে বর্তমানে আকাশ ডাকাতির বিষয়টা তাই খুবই প্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারে, রেশন নেবার সময় ও দোকানে সর্ব্বত্রই দূরত্ব বজায়ের বিধান দেওয়া হয়েছে –কীভাবে যে তা রক্ষা করা সম্ভব সেটা কেউই ভাবছে না। স্বল্প পরিসরেই বর্তমানে বাজার বা দোকানগুলো রয়েছে। সাধারণ অবস্থাতেইতো বাজারে ঢুকতে ধাক্কাধাক্কি বা ঝগড়াঝাঁটি লাগে। ছুটির দিনে বা মাসের প্রথম দিকে মাছের বাজারে ঢুকতে গেলে দোকানিরা বলে “আপ কাতার মে হ্যায়”। বর্তমানে এক্কাদোক্কা খেলার মতন গোল গোল দাগ কাঁটা দেখে আমার মনে এলো – কীভাবে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে বাজার/হাট করা সম্ভব। এত জায়গা কোথায়? রাজারহাটে নির্দিষ্ট দূরত্ব মেনে বাজার করা সম্ভব হলেও – শহরগুলোতে জনসাধারনের বাজারে বিধান মেনে চলা অসম্ভব। বর্তমান অবস্থায় প্রস্তাবটি অবাস্তবও বটে।’

তিনি বলেছেন , ‘সমাজকর্মী হিসেবে যেটা বলতে চাইছি তা হচ্ছে , এই অদ্ভুতুরে নগরায়ণ যদি আমরা এখনই বন্ধ না করতে পারি তাহলে কিন্তু বিপদ আসবেই। সেই বিপদের অনেক অভিমুখ রয়েছে – যেটা নগরপতি, সমাজপতি বা রাজনিতীর কারবারিরা বুঝতে চাইছেন না। আমাদের ছোট্টো ডিঙিতে এখন অনেক বেশী লোক উঠে পড়েছে, যদি এটাকে একটু হাল্কা না করা যায় তবে করোনা থেকে বাঁচলেও কিন্তু ভবিষ্যতে জলে ডুবে মৃত্যু রোধ করতে পারা যাবে বলে মনে হয় না।’