দেবময় ঘোষ, কলকাতা: ‘‘আমার ভগবান আপনার ভগবানের থেকে বেশি ভালো, ক্ষমতাশালী …’’- এই ধারণা ভারতে যত জনপ্রিয় হবে, দেশের বিপদ বাড়বে৷ ঈশ্বর নিয়ে অসাধু প্রতিযোগিতা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোকেই ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে পরে, মনে করেন সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি৷ যদিও ভারতীয় জনমানসে ধর্মীয় বোধের বিরোধী নয় সীতারাম৷ সিপিএমের সাধারণ সম্পাদকের মতে, মানুষের স্বাভাবিক ধর্মাচরণের পক্ষেই কথা বলেছে পার্টি৷ কিন্তু বিরোধিতা করেছে, প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতার৷

সীতারাম ইয়েচুরিকে যাঁরা কাছ থেকে চেনেন তেমন অনেকেই এই গল্প জানেন৷ কমিউনিস্ট নেতার নাম সীতারাম। তাতে বিন্দু মাত্র অসুবিধা হয়নি সিপিএমের সেই তরুণ নেতার। বাবা-মায়ের দেওয়া নাম কখনও পরিবর্তন করার চিন্তা মাথায়ও আসেনি কমরেড সীতারামের। শুধু যা পরিবর্তন করেছিলেন, তা হল জাতের পরিচিতি। পিতামহের নাম অনুসারে ছিলেন সীতারামরাও। তেলুগুভাষী ব্রাহ্মণ। কিন্তু পরবর্তীকালে নিজের নামটা নিয়েই এগিয়ে চললেন সীতারাম। ছেড়ে এলেন জাত।

তবে পৈতে নিয়ে বেশ বেকায়দায় পড়েছিলেন সীতারাম। এগারো বছর বয়সে উপনয়নের পর তাঁকে পৈতে অর্পণ করা হয়েছিল। সংবাদপত্রকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে একবার সীতারাম বলেছেন, প্রায় দশ বছর শরীরে পৈতে ঝুলিয়ে রেখেছিলেন। শেষে, হোস্টেলে ময়লা জামাকাপড়ের সঙ্গেই ফেলে আসেন সেটি।
ততদিনে ছুটিতে বাড়ি ফিরেছেন। বাবার চোখে পড়ল, সীতারামের পৈতে নেই। তিনি ভেবেছিলেন সীতা হয়তো পৈতে হারিয়ে ফেলেছে। প্রথা অনুযায়ী, বাবা নিজের পৈতে এগিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। বাবার চোখের দিকে তাকাতে পারেননি সীতারাম। অস্ফুট স্বরে বলেছিলেন, পৈতেটা অন্য জায়গায় রেখে এসেছি। সেই সাক্ষাৎকারে, সীতারাম বলেছেন, “ময়লা জামা কাপড়ের গাদায় পৈতে ঝুলিয়ে এসেছি, বাবাকে তা বললে ধর্মের অবমাননা করা হত।”

পড়়ুন: তৃণমূল নেতার ‘মুন্ডু কেটে ফুটবল খেলার’ হুমকি পোষ্টার

সেদিনও যা করেননি, আজও সেবিষয়ে সতর্ক সীতারাম৷ ধর্মাচরণের স্বাধীনতা থাকুক, তা-ই চান তিনি৷ ভোট পরবর্তী সময়ে স্লোগান রাজনীতিকে গায়ে মাখছেন না সীতারাম৷ তার বক্তব্য, “জয় শ্রী রাম নিয়ে আমার কোনও সমস্যা নাই৷ জয় মা কালী নিয়েও নেই৷ জয় হিন্দ নিয়েও নেই৷ শুধু একটাই চিন্তা, কোন ভগবান বেশি বড়, বেশি ভালো বা বেশি শক্তিশালী এই প্রতিযোগিতা কলকাতার রাস্তায় যেন শুরু হয়ে না যায় তা দেখতে হবে৷ ওই ঘটনার থেকে দুর্ভাগ্যজনক কিছু আর হতে পারে না৷”

লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা হওয়ার পর বাংলায় ‘জয় শ্রী রাম’ ধ্বনি নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে৷ সেই বিতর্কে অনেকাংশে জড়িত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ জয় শ্রী রাম কি শুধুই একটি ‘ধর্মীয় ধ্বনি’নাকি ‘রাজনৈতিক স্লোগান’ তা নিয়েও বিতর্ক তুঙ্গে৷ এর মাঝেই বিজেপি নতুন স্লোগান তৈরি করেছে – ‘জয় মা কালী, জয় শ্রী রাম৷’ শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের পালটা স্লোগান – ‘জয়হিন্দ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জিন্দাবাদ৷’

সিপিএমের সাধারণ সম্পাদকের মতে বাংলার পক্ষে বিজেপি-তৃণমূল কেন বিপজ্জনক তা এই স্লোগান রাজনীতিতেই পরিষ্কার হয়েছে৷ ধর্মীয় রাজনীতির বিপদ বোঝাতে সীতারাম ১৯৪৭-এর ১৫ অগস্টের কথা উল্লেখ করেছেন- ওইদিন মহাত্মা গান্ধী দিল্লিতে ছিলেন না৷ ছিলেন, শহর কলকাতায়৷ ভয়ঙ্কর গোষ্ঠী সংঘর্ষ থামাতে তৎপর ছিলেন তিনি৷ শুধু এই কারণেই ধর্মীয় রাজনীতি থেকে পিছিয়ে আসতে হবে৷ এই কারণেই তৃণমূল-বিজেপি বাংলায় পক্ষে শুভ নয়৷