সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়: সময়ের চাকা ঘোরে আর তার সঙ্গে ভাগ্যের চাকাও ঘুরতে থাকে ৷ সেটা ব্যক্তির মতো সংস্থার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য ৷ একদিন যে জায়গা থেকে টাটা তাড়াও আন্দোলন গোটা দেশের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল এবার সেই জায়গা থেকেই টাটা ফেরানোর দাবি উঠছে ৷ সেই স্থানে রাজনৈতিক আধিপত্যেরও বদল ঘটছে ৷ লাল থেকে ঘাসফুল হয়ে এবার পদ্মে মজেছে সিঙ্গুর ৷

বাম জমানায় তৎকালীন টাটা গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান রতন টাটা এরাজ্যের সিঙ্গুরে ন্যানো গাড়ির কারখানা গড়তে গেলে স্থানীয় চাষিদের একাংশের বাধার মুখে পড়েন৷ সেই অনিচ্ছুক চাষিদের জমি অধিগ্রহণের বিরোধিতা করা আন্দোলন এমন পর্যায়ে যায় যে গোটা দেশের নজর কাড়ে ৷ আর বাংলার তৎকালীন বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই আন্দোলনে চাষিদের পাশে দাঁড়িয়ে রাজ্যে তিনি তাঁর রাজনৈতিক জমিকে আরও সুদৃঢ় করেন৷ বিরোধিতার মুখে পড়ে টাটার ন্যানো প্রকল্প এই রাজ্যের সিঙ্গুর থেকে সরিয়ে গুজরাটের সানন্দে নিয়ে যান৷

পড়ুন: হাসতে হাসতেই মমতার থেকে মুখ ফিরিয়েছে পাহাড়: বিশ্লেষণ

টাটাকে সিঙ্গুর থেকে তাড়ানোর কিছুদিনের মধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সিঙ্গুরের জমি আন্দোলনের সুফল পান৷ রাজ্যে পালাবদল হওয়ায় ক্ষমতায় আসেন তিনি৷ তবে তিনিও মুখ্যমন্ত্রী হয়ে অনিচ্ছুক চাষিদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পালনের জন্য চাষিদের জমি ফেরানোয় উদ্যোগী হন৷ কিন্তু তা করতে গেলে টাটাদের সঙ্গে রাজ্য সরকারের বিবাদের জেরে মামলা শুরু হয়৷ বেশ কিছুদিন ধরে আইনি লড়াই চলার পরে অবশেষে সুপ্রিম কোর্ট চাষিদের জমি ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। তারপর সেই মতো জমি ফেরানোর প্রক্রিয়া শুরু করে রাজ্য সরকার৷

জমি ফিরছে ঠিকই কিন্তু সেটা কেমন জমি সেই প্রশ্নও উঠেছে ইদানিং ৷ কারণ ওই জমির উপরে থাকা ন্যানো গাড়ির কারখানার কাঠামো উপড়ে যেটা ফেরত দেওয়া হচ্ছিল সেটা আদৌ চাষযোগ্য রয়েছে তো ?

২০১১ সালে রাজ্যে পালা বদল হয়ে ক্ষমতায় এসেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আর তার আট বছর পরে ২০১৯ সালে লোকসভা ভোটে বিজেপির কাছে বড় ধাক্কা খেতে হল শাসক দলকে ৷ ৪২টি আসনের মধ্যে তৃণমূল পেল ২২টি আর বিজেপি-র ঝুলিতে ১৮টি আসন৷ রাজ্যের শাসক দলকে হতাশ করেছে সিঙ্গুরের মানুষ। উল্টে সেখানে এবার শিল্পের দাবিতে মিছিল হল। এই বিধানসভা কেন্দ্রটি পড়ছে হুগলি লোকসভা কেন্দ্রতে৷ আর ওই কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী লকেট চট্টোপাধ্যায়ের প্রচারের সময় বলেছিলেন আবার জয়ের পরেও জানিয়েছেন, সিঙ্গুরে টাটারা যাতে ফের ওইখানে কারখানা গড়তে আসেন সেই চেষ্টাই করবেন৷ অর্থাৎ মানুষের চাহিদা যে বদলে গিয়েছে সেটা এই জনপ্রতিনিধি বুঝতে পেরেছেন৷ হুগলি লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত এই বিধানসভায় লকেট চট্টোপাধ্যায় তৃণমূল প্রার্থী রত্না দে নাগের চেয়ে ১০ হাজার ৪২৯ বেশি ভোট পান ৷

টাটা গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে এই ব্যাপারে কোনও মন্তব্য শোনা যায়নি৷ তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চেয়ে রতন টাটা যে নরেন্দ্র মোদীকে পছন্দ করেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না৷ কারণ মমতা বিরোধিতার জেরে সিঙ্গুর থেকে থেকে প্রকল্প তড়িঘড়ি সরানোর সময় রতন টাটা মোদীরই সাহায্য নিয়েছিলেন ৷ সানন্দে জমি দিয়ে সেখানে ন্যানো কারখানা করতে টাটা গোষ্ঠীকে আহ্বান জানিয়েছিলেন তৎকালীন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী৷

সময় বদলেছে এখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রীর বদলে নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী আর তাঁর যে এখন পাখির চোখ বাংলা তা ভোটের আগে তিনি এবং তার সেনাপতি অমিত শাহ যথাক্রমে ১৭ এবং ১৬ বার প্রচারের এসে বুঝিয়ে দিয়েছেন৷ তাঁর দল ক্ষমতায় এলে এ রাজ্যেতে শিল্পে চমক দেওয়ার চেষ্টা করবেন চনমনে গুজরাটের উদ্যোক্তা মোদী বলেই বিভিন্ন মহলের ধারণা ৷ তবে এটাও ঠিক সময় বদলেছে, রতন টাটা এখন আর সেই সময়ের মতো টাটা গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান নন ৷ ওই পদ থেকে অবসর নিয়ে তিনি এখন চেয়ারম্যান এমিরেটাস ৷ কিন্তু এই শিল্প গোষ্ঠীতে তাঁর ক্ষমতা কমেছে সে কথা বলা হলফ করে বলা উচিত হবে না৷ কারণ কয়েক বছর আগে তাঁর সঙ্গে বিবাদের জেরে তাঁরই হাত থেকে ব্যাটন নেওয়া টাটা গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান হওয়া সাইরাস মিস্ত্রিকে ওই পদ থেকে যেভাবে সরে যেতে হয়েছে তাতে প্রতিফলিত হয় এখনও এই শিল্প গোষ্ঠীতে তিনিই যেন শেষ কথা৷ সেক্ষেত্রে ফের রাজনৈতিক পালাবদলের পর যদি কারখানা খোলার সুযোগ আসে তখন তিনি তা লুফে নিতেই পারেন এবং সেটাই হবে তাঁর পক্ষে মমতাকে মোক্ষম জবাব৷

তবে গত মাসে এ রাজ্যের প্রতি কিছুটা আগ্রহ বাড়াতে দেখা গিয়েছে টাটা গোষ্ঠীকে ৷ ওডিশা থেকে টাটা স্পঞ্জ আয়রন তাদের রেজিস্টার্ড অফিস পশ্চিমবঙ্গে সরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে কারণ এই প্রস্তাব গত মাসে সংস্থার পরিচালন পর্ষদ অনুমোদন করেছে ৷ তাছাড়া এই শিল্প গোষ্ঠী নির্মাণ ও খনির সরঞ্জাম উৎপাদনকারী সংস্থা টাটা হিতাচির মূল কর্মকাণ্ড ঝাড়খণ্ড থেকে খড়গপুরের কারখানায় সরে আনতে চেয়েছে ৷

আবার এই ন্যানো গাড়ি সিঙ্গুর থেকে সানন্দে গেলেও সেই গাড়ি বাজার ধরতে ব্যর্থ হয়েছে ৷ ন্যানো বিরোধীরা এখনও তাই যুক্তি দেখান সিঙ্গুরে ন্যানো কারখানা হলেও তা অচিরে বন্ধ হত ৷ কিন্তু এ রাজ্যে গাড়ির জগতের বৈপরীত্য সেটাই দুটি গাড়ির সংস্থার বিরুদ্ধে একেবারে বিপরীত মতবাদ ৷ বিড়লা গোষ্ঠীর হিন্দুস্তান মোটর্সের একচেটিয়া বাজার ছিল অ্যাম্বাসাডর গাড়ির দৌলতে ৷ কিন্তু অভিযোগ ওঠে, উন্মুখ বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ল হিন্দ মোটরস কারণ সময়ের সঙ্গে নতুন মডেলের গাড়ি আনতে পারল না বলে৷ টাটা মোটর্সের ন্যানো যদি ব্যর্থও হয় তবে অন্য মডেলের নতুন গাড়ি নিয়ে আসতে দোষের কি ?