তিমিরকান্তি পতি, বাঁকুড়া: প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সারা দিন ধরে চলল আদিবাসীদের শিকার উৎসব। বাঁকুড়ার জয়পুর জঙ্গলে প্রাচীন ঐতিহ্য আর পরম্পরা মেনে দাপিয়ে বেড়ালেন হাজারো আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ। জয়পুরের জঙ্গল নীরবে সাক্ষী বনশুয়োর, খরগোশ থেকে অন্যান্য জীবজন্তুর অবাধ হত্যা লীলার।এদিনের শিকার উৎসবে বাঁকুড়ার গণ্ডী ছাড়িয়ে পুরুলিয়া, পশ্চিম মেদিনীপুর আর বর্ধমানের একাংশের আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ হাজির হয়েছেন জয়পুর জঙ্গলে।

তীর, ধনুক, বল্লম, কেঁচা নিয়ে ছোট ছোট দলে চলছে শিকার উৎসবের নামে বন্য জীবজন্তু হত্যাকাণ্ড। শিকার উৎসবে অংশ নেওয়া আদিবাসী সমাজের মানুষেরাও স্বীকার করেছেন, তারা জানেন বর্তমানে শিকার উৎসব বেআইনি। তারপরেও নিজস্ব জনজাতির প্রাচীন প্রথা টিকিয়ে রাখতেই বছরের এই নির্দিষ্ট দিনে জয়পুর জঙ্গলে হাজির হয়ে যান তারা। এই বিষয়ে অনেকের যুক্তি, আমরা সাধারণ জীবজন্তু তো মারিনা। কেবল মাত্র বেছে বেছে হিংস্র জীবজন্তুই শিকার করি।

তারা আরও জানিয়েছেন, প্রতিবছর বৈশাখ মাসের তিন তারিখে তালডাংরার জঙ্গলে বঙ্গা বীর নামে শিকার উৎসবের সূচনা হয়। পরে পাঁচ বৈশাখ জয়পুরে সেঁদড়া ও ইভাবে নির্দিষ্ট দিনে ধারাবাহিকভাবে শিকার উৎসব চলতেই থাকে বুদ্ধ পূর্ণিমার দিন পর্যন্ত। ওই দিন পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ে শিকার উৎসবের মধ্যে শেষ হয় প্রাচীন এই প্রথা।

কিভাবে এই উৎসবের সূচনা? এই প্রশ্নের উত্তরে অংশগ্রহণকারী শিকারিরা জানিয়েছেন, রাম, লক্ষণ ও সীতার বনবাস সময়কাল থেকেই এই প্রথা শুরু হয়েছে। তবে সঠিক দিন, ক্ষণ তাদের জানা নেই বলেই জানিয়েছেন। শিকার উৎসব উপলক্ষে এদিন জয়পুর জঙ্গল জুড়ে উৎসবের চেহারা নিয়েছিল। অনেক ছোট ব্যবসায়ী শসা, মুড়ি, তেলেভাজার পসরা নিয়ে বসেছিলেন জঙ্গলের বিভিন্ন অংশে।

শিকারে অংশ নেওয়া হারাধন টুডু, সুনীল মাণ্ডিরা বলেন, প্রশাসন থেকে শিকার উৎসবের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি আছে ঠিকই, তবে আমাদের বংশপরম্পরায় যে ঐতিহ্য চলে আসছে তা আমরা রক্ষা করে চলেছি মাত্র। এখন বনের গাছ অবাধে কেটে ফেলা হচ্ছে স্বীকার করে নেন তাঁরা৷ বলেন, এখন আর সেভাবে বন্য জীবজন্তু মেলে না।
এদিন কয়েকটি বনশুয়োর ও খরগোশ শিকার করতে পেরেছেন বলে তারা জানান।

যদিও এবিষয়ে জয়পুর বনাঞ্চলের বনাধিকারীকের প্রতিক্রিয়া মেলেনি। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। অন্যান্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীরা এবিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকার করেছেন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যখন প্রশাসনিক স্তরে শিকার উৎসব বেআইনি ঘোষণা করা হয়েছে, তারপরেও অবাধে উৎসবের বন্যপ্রাণীর হত্যা লীলা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে বনবিভাগের জয়পুর বনাঞ্চলের আধিকারিকদের ভূমিকা নিয়েও বিরাট এক প্রশ্ন চিহ্ন দেখা দিয়েছে সব মহলেই।