সুপর্ণা সিনহা রায়, কলকাতা:  কয়েক’শ বছর আগে দক্ষিণের মন্দিরে কান পাতলে শোনা যেত ঘুঙুরের শব্দ। ভগবানের পূজায় জীবন উৎসর্গ করতেন দেবদাসীরা। হাতের মুদ্রায়, দেহের ভঙ্গিতেই ভক্তি নিবেদন করতেন তাঁরা। সেই শুরু ভরতনাট্যমের ইতিহাস। পরম্পরায় চলে আসা সেই ঐতিহ্যে আঘাত হেনেছিল ব্রিটিশরা। দেবদাসীদের কাপড়ে লেগেছিল কাদার ছিটে। ভারতীয় নৃত্যের প্রাচীনতম নিদর্শনকে সমূলে উৎপাটন করতে চেয়েছিল ব্রিটিশরা।

ঠিক যেভাবে স্বাধীনতা অর্জন করেছে ভারত, সেভাবেই শত্রুর হাত থেকে সেই শিল্পকলাকে রক্ষা করেছে ভারতীয়রা। প্রাচীন মন্দিরের প্রত্যেকটা মূর্তি সাক্ষী সেই লড়াইয়ের ইতিহাসের। পেরিয়েছে অনেক গুলো বছর। সমূলে বিনাশ তো দূরের কথা বরং প্রাচীন বটবৃক্ষের মত শাখা-প্রশাখা বিস্তার হয়েছে সুদূরে। ভারতের সেই ঐতিহ্য আর পরম্পরাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রতিনিয়ত চেষ্টা করছেন যাঁরা, প্রেরণা গঙ্গোপাধ্যায় তাঁদের মধ্যে একজন। মাত্র ৩১ বছর বয়সেই তিনি শিক্ষাগুরু। ভরতনাট্যম নৃত্য শিক্ষা দেন অনেক ছাত্রীকে। বেহালায় চিদানন্দ ডান্স অ্যাকাডেমিতে রয়েছে তাঁর বহু ছাত্রী।

বেশ কয়েক বছর ধরেই নাচ শেখাচ্ছেন তিনি। নিজের নৃত্য শিক্ষা শুরু করেন মাত্র ৩ বছর বয়সে। এত বছর ধরে নাচই তাঁর সবথেকে কাছের বন্ধু। পেশা তো বটেই! কিন্তু শুধুই ভালোবাসেন বলে নাচ নয়, নাচ তাঁর কাছে একটা সংগ্রাম। এক শিল্পকলার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা। তিনি মনে করেন, শিকড়টাকে অটুট রেখে যদি বাঁচার জন্য নতুনত্বের দরকার পড়ে, সেও ভালো। তিনি স্বীকার করেন, ঘরে ঘরে আজ বলিউডি গানের কদর বেড়েছে। শিশুরা ছোট থেকেই সেই গানের তালে তাল দিচ্ছে। দর্শক কমছে ধ্রুপদী নৃত্যের।

আর এভাবে চলতে থাকলে ভরতের নাট্যশাস্ত্র (যা থেকে ভরতনাট্যমের উৎপত্তি বলে উল্লেখ পাওয়া যায়) হয়ত একদিন স্মৃতির অতলে চলে যাবে। তাই প্রেরণা বলেন, ‘ফিউশনে আপত্তি নেই।’ অর্থাৎ নাচের এই ফর্মটাকেই সময়োপযোগী করে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলেছেন তিনি। পাশাপাশি, ভাষার কথাও মনে করিয়ে দেন প্রেরণা। ছোটবেলা থেকে ভরতনাট্যম শেখার সুবাদে নিজেই দক্ষিণী ভাষার গান গেয়ে ওঠেন অনায়াসে। কিন্তু, আপামর ভারতবাসী যে সেই ভাষা বোঝে না!

তাই তিনি মনে করেন, ফিউশনের দরকার আছে। তাতে প্রাচীন শিল্পের সম্মান ক্ষুণ্ণ হবে না বরং দেবে নতুন জীবনীশক্তি। প্রত্যেক শিল্পীর মতই স্ট্রাগলের কথা শোনা যায় তাঁর মুখেও। তবে সেই লড়াইটা ভালোবাসার, কষ্টের নয়। একজন শিল্পী হিসেবে নিজের দর নয়, স্ট্যান্ডিং ওভেশন-কেই জীবনের সেরা প্রাপ্তি বলে মনে করেন তিনি। দর্শকরা যখন উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দেন, তখনই প্রেরণা অনুভব করেন, যেন জীবনের সবটুকু তাঁর পাওয়া হয়ে গিয়েছে। ‘সুরে ঘুঙুরে’র প্লাটফর্ম তাঁর কাছে একেবারে ‘ইউনিক।’

এখানে কোনও দেওয়া-নেওয়ার পলিসি নেই। প্রেরণার কথায়, ঠিক যেভাবে নিজের শিল্পযাপন করেন তিনি, সেটাই দেখানো সম্ভব হয়েছে এই প্লাটফর্মে। আর CFP Films ও Kolkata24x7 বলছে, ‘প্রেরণার হাত ধরে আরও জীবনীশক্তি পাক ভারতনাট্যম।’